সর্বশেষ সংবাদ :

ফুটপাত গিলে সড়কে দোকান

সবুজ ইসলাম: রাজশাহী মহানগরীতে ফুটপাত দখল যেন বহুদিনের পুরনো চিত্র। তবে সম্প্রতি সেই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন আর শুধু ফুটপাত নয়, নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর বড় অংশই চলে যাচ্ছে অবৈধ দখলে। রাস্তার উপরই বসছে ফলের দোকান, ফাস্টফুডের স্টল, কাপড়ের দোকান, সবজি ও নিত্যপণ্যের অস্থায়ী বাজার। এতে সড়ক সরু হয়ে যানজট বাড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যান চলাচল, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও। নগরবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই এমন দখলদারিত্ব চললেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে সড়ক দখল যেন খুবই সামান্য বিষয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজশাহী নগরীর শালবাগান মোড়, নিউমার্কেট এলাকা, রানীবাজার, হড়গ্রাম কাঁচাবাজার, ভদ্রা মোড়, সাহেবাজার জিরোপয়েন্ট, লক্ষীপুর মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়কের উপরেই গড়ে উঠেছে নানা ধরনের দোকান। কোথাও রাস্তার একাংশ দখল করে ফল বিক্রি হচ্ছে, কোথাও কাপড়ের অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। আবার কোথাও পলিথিন টাঙিয়ে কিংবা টিন ও কাঠ দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরি করে ব্যবসা চালানো হচ্ছে প্রকাশ্যেই।
বিশেষ করে নগরীর সাহেববাজার ও শালবাগান মোড়ে চিত্রটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। শালবাগান মোড়ে অন্তত ১৪টি ফলের দোকান ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে। এর মধ্যে কয়েকটি দোকান রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের অংশেও চলে এসেছে। এতে যানবাহন চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে প্রায়ই তৈরি হচ্ছে যানজট। ভারী যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দোকানদার বলেন, “ফুটপাতে দোকান ছিল, এখন কিছু দোকান রাস্তার ওপরও চলে এসেছে। এটা ঠিক হচ্ছে না। যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু দেখার যেন কেউ নেই। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে বাধা না থাকায় দিন দিন দোকান বাড়ছে।”
সাহেবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায় আরও ভয়াবহ চিত্র। সড়কের ওপর পলিথিন টাঙিয়ে, বাঁশ ও কাঠের খুঁটি গেড়ে অস্থায়ী কাপড়ের দোকান বসানো হয়েছে। এতে রাস্তার একপাশ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট যানবাহন, রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের চাপ বাড়ায় প্রতিদিনই সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। পথচারীদের চলাচলেও দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ।
এদিকে লক্ষীপুর মোড় থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের রাস্তা পর্যন্ত সড়কের দুপাশেই ফুটপাত দখল করে অস্থায়ী খাবারের দোকান বসানো হয়েছে। এতে হাসপাতালগামী যাত্রীরা তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছেন।
কয়েকজন পথচারী ও বাসিন্দার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তারা সড়ক ও ফুটপাত দখল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। পথচারী রকিবুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কর দিই, সিটি করপোরেশন নানা খাতে রাজস্ব নেয়। কিন্তু নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিকভাবে রাস্তা ব্যবহার করার অধিকারটুকুও যেন হারিয়ে ফেলছি। ফুটপাত দখল ছিলই, এখন সড়কও দখল হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর না হয়, তাহলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”
রিকশাচালক আব্দুল কাদের বলেন, “আগে যে রাস্তা দিয়ে সহজে যাওয়া যেত, এখন সেখানে দোকানের কারণে জ্যামে আটকে থাকতে হয়। যাত্রী বিরক্ত হয়, সময় নষ্ট হয়, আয়ও কমে যায়। অনেক সময় হঠাৎ মানুষ রাস্তার মাঝখানে নেমে পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “যারা বৈধভাবে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছে, তারা নানা খরচ বহন করছে। অথচ রাস্তা দখল করে যারা ব্যবসা করছে, তাদের কোনো নিয়ম-নীতি মানতে হচ্ছে না। এতে একদিকে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সড়ক ও ফুটপাত নগরবাসীর চলাচলের জন্য। এগুলো দখল হয়ে গেলে শুধু যানজট নয়, জরুরি সেবা যেমন অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহন চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর নাগরিকদের আস্থা কমে যাচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর রাজশাহী জেলা সভাপতি সফিউদ্দিন আহমেদ বলেন,“রাজশাহী নগরীতে ফুটপাত ও সড়ক যে শুধুমাত্র নিম্ন আয়ের হকার বা ছোট ব্যবসায়ীরা দখল করে আছে তা নয়। এখানে একটি বড় শ্রেণিও আছে যারা নিয়মিত সড়ক ও ফুটপাত দখল করে আছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে আমাদের যারা হকার আছে তাদের যদি ব্লাইন্ড স্পর্ট বা যেগুলো রাস্তায় গাড়ি চলাচল খুবই সামান্য হয় সেগুলো রাস্তায় মুভিং করতে হবে। সড়কে কোনভাবেই বসতে দেওয়া যাবে না। একটি নির্দিষ্ট গন্ডির ভিতরে তাদেরকে রাখতে পারলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।”
সিটি করপোরেশন থেকে নগরীর হাকারদের তালিকা করা হবে এবং আলাদা একটি জায়গায় তাদের বসার ব্যবস্থা করা হবে জানিয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন,“যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তারাই কিন্ত সড়কে বসছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যেভাবে হকারদের তালিকা করা হয়েছে সেই একই আদলে রাজশাহীতেও ঈদের পরে হাকারদের তালিকা করা হবে। তারপরে তালিকানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তারা বসতে পারবে। নগরীর যানজট ও ফুটপাত দখল নিয়ে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহী নগরী পরিদর্শন করেছেন। তিনি আমাকে এই নগরী সাজানোর দায়িত্ব দিয়েছেন। আশা করছি আমরা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি খুব শ্রীঘই সমাধান করা হবে।”


প্রকাশিত: May 5, 2026 | সময়: 5:35 am | সুমন শেখ