চালের বাজারে আগুন, বিপাকে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

জুলইকরাম ফেরদৌস ইবতিদা: মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের পাতে আটাশ ও জিরাশাইল জাতের চালের ভাতগুলো বেশি থাকে। নিম্ন আয়ের মানুষের পাতে স্বর্ণা বা গুটি স্বর্ণা জাতের চালের ভাত বেশি ঠাঁয় পায়। আর বাজারে সেইসব চালের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ক্রেতাদের মধ্যে। রাজশাহীতে এক মাসের ব্যবধানে এই চালের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ।
চালের বাজারে অস্থিরতার জন্য মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দোষারোপের পালা অব্যাহত রয়েছে। ব্যবসায়ীর অভিযোগ, মিল মালিকরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মজুদের ঘাটতির অজুহাতে চালের দাম বাড়াচ্ছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও এই কারসাজি ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে। অন্যদিকে, মিল মালিকরা বলছেন, ধানের বাজারে মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। ধানের সরবরাহ কম থাকায় মিল পর্যায়ে চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ধানের উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও চালের মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
ক্রেতারা বলছেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও চালের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের চালের। গত এক মাসের মধ্যে চালের দাম সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যত দিন যাচ্ছে চালের দাম যেন ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে চালের এই দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা একে অপরকে দোষারোপ করছেন। রাজশাহীর সাহেব বাজার, নিউ মার্কেটের পূর্ব পার্শ্বে চালের আড়তসহ বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, সব ধরনের চালের দামই বেড়ে গেছে। বিশেষ করে এক সপ্তাহের ভেতরে আটাশ ও জিরা জাতের চালের দাম বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি।
রাজশাহী মহানগরীর সাহেব বাজারের মেসার্স সুশীল চাল ভান্ডারের বিক্রেতা রাজু আহমেদ জানান, বর্তমানে ৫০ কেজির আটাশ চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার ৬০০ টাকায়। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এই চাল বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৯০০ থেকে তিন হাজার টাকায়। ধাপে ধাপে দাম বাড়ায় ক্রেতারাও পড়ছেন বিপদে। আমরা নিজেরাও লাভ করছি না কারণ পাইকাররা বেশি দামে আমাদের চাল দিচ্ছে।
মেসার্স এ পি চাউল ভান্ডারের ব্যবস্থাপক অশোক প্রসাদ জানান, মধ্যবিত্তরা সাধারণত আটাশ ও মিনিকেট চাল বেশি কেনেন। আবার ছাত্ররা বেশি কেনেন মোটা জাতের চাল। মোটা জাতের স্বর্না চালের দাম বেশি না বাড়লেও চিকন জাতের চালের দাম কেজি প্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তিনি দাবি করছেন বর্তমানে এই চালের মজুদ কম থাকায় দাম বেড়ে গেছে। অশোক প্রসাদ আরো বলেন, নভেম্বরের শেষ দিক থেকে নতুন ধান বাজারে আসলেও বাজারে সে অনুপাতে চালের দাম কমছে না।
ভাই ভাই রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মামুন হোসেন বলেন, মোটা চালের পাইকারি দামও প্রতি বস্তায় ৮০ থেকে ১২০ টাকা বেড়েছে। মিল মালিকরা সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে বেশি দাম নিচ্ছে। আসলে তাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়াচ্ছে।
মা রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক নুরুল আমিন বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে ধানের দাম বেড়ে যাওয়া একটি বড় কারণ। মিল মালিকরা নতুন মৌসুম শুরুর পর আগে থেকে মজুদ করা চাল বেশি দামে বিক্রি করছে। এর ফলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। এদিকে কাটারি ভোগ ও নাজিরশাইল জাতের চালের দামও বেড়েছে। মানভেদে প্রতি বস্তায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কাটারি চাল প্রতি বস্তায় তিন হাজার ৪০০ থেকে তিন হাজার ৯০০ টাকায় এবং নাজিরশাইল চাল তিন হাজার ৪০০ থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খায়রুল চাউল কলের স্বত্বাধিকারী খায়রুল ইসলাম বলেন, নতুন ধানের দাম বেশি তাই চাউলের দাম ও একটু বেশি। আমরা মিল মালিকরা ধান বেশি দামে কিনে সেটাকে প্রক্রিয়াজাত করে তো আর কম দামে চাল বিক্রি করতে পারব না। ধানের দাম বেশি লেবারের খরচ বেশি সব খরচ দিয়ে অল্প কিছু লাভ করে আমাদের চাউল বিক্রি করতে হয়। তারমধ্যে সরকার পতনের পর যে যার মতো জিনিসের দাম বাড়াচ্ছে। এখানে তো আমাদের করার কিছুই নেই।
খুচরা পর্যায়ে চালের এই দাম বৃদ্ধির ফলে ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। টিকা পাড়ার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, এক সপ্তাহ আগে আটাশ চাল ৬৫ টাকা কেজি দরে কিনেছি, আর আজ দোকানদার চাইছে ৭০ টাকা। ছয় মাস আগেও এই চালের দাম ছিল ৫৫ টাকা। গত কয়েক মাসে ধাপে ধাপে দশ বারের অধিক চালের দাম বেড়েছে।
সাহেব বাজারে বাজার করতে আসা স্কুলশিক্ষক রবিউল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজশাহীতে চালের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তাতে কেজি ১০০ টাকায় গিয়ে ঠেকতে আর খুব বেশিদিন সময় লাগবে না। তিনি চালের দাম বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন।
রাজশাহী জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বিপুল বিশ্বাস বলেন, আমাদের কাজ হচ্ছে বাজারে কোথাও কোনো ব্যবসায়ী মজুদদারি বা সিন্ডিকেট করছে কি না তা তদারকি করা। যদি প্রমাণ পাই, আমরা অভিযানে গিয়ে ব্যবস্থা নেব। তবে বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব নয়। ব্যবসায়ীরা যদি দাম নিয়ে কারসাজি করে, আমরা সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
রাজশাহী কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাহানাজ পারভীন বলেন, এবার ধানের ফলন আগের চেয়ে কম হয়েছে। তাই দেশে ধানের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তারপরও চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা গুটিকয়েক মিলমালিকের কারণে। তারা করপোরেট চাল কোম্পানির সঙ্গে মিল রেখে চালের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে দিচ্ছেন। দাম বাড়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।


প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৭, ২০২৫ | সময়: ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ