বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মহিদুল ইসলাম, ঈশ্বরদী: লিচুর রাজধানী খ্যাত ঈশ্বরদী এখন পাকা লিচুর রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। ঈশ্বরদী পৌরসভা সহ ৭টি ইউনিয়নের যেদিকে তাকানো যায় শুধু লাল টসটসে রঙিন লিচু আর লিচু। গত বছরের তুলনায় এবছর ঈশ্বরদীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় বৃষ্টিও হয়েছে সময়মত। এজন্য গাছে গাছে লিচুর প্রচুর মুকুল ধরলেও তা রয়ে গেছে গাছেই। দামও বেশ ভালই পাচ্ছেন লিচু চাষীরা। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কায় রয়েছেন ঈশ্বরদীর লিচু চাষীরা।
গত বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর ফলন তেমন ভাল না হলেও এবছর ঈশ্বরদীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছর বৈরি আবহায়ওয়ার কারণে লিচুর ফলন বির্পযয় হলেও এবছর সেই ক্ষতি পুষিয়ে যাচ্ছে লিচু চাষীদের। বর্তমানে লিচুতে জমজমাট হয়ে উঠেছে ঈশ্বরদীর অর্থনীতি।
ঈশ্বরদী কৃষি অফিস জানায়, এ বছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভবনা ধরা হয়েছে ঈশ্বরদীতে। বিগত সময়ে ঈশ্বরদীতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। কৃষি অফিস আরও জানায়, প্রতিবছরই চাষীরা অন্য আবাদ কমিয়ে লিচু চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। চলতি বছর ঈশ্বরদীতে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। গত বছর শতকরা ৩০ ভাগ গাছে লিচু ধরলেও এবছর প্রায় ৯০ ভাগ গাছে প্রচুর মুকুল ধরেছে। মুকুল এবং গুটির সময় আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। ঈশ্বরদীর প্রতিটি বাগানে বাতাসে দোল খাচ্ছে থোকায় থোকায় লাল রং এর পাকা রঙিন লিচু। বুধবার উপজেলার বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে এসব চিত্র পাওয়া গেছে।
লিচু আবাদের কারণে অনেক ব্যক্তির নামের আগে যোগ হয়েছে ‘লিচু’ শব্দটি। এদেরই একজন আব্দুল জলিল কিতাব মন্ডল। তিনি লিচু কিতাব নামেই পরিচিত। কয়েক বছর আগে তিনি লিচু চাষের জন্য জাতীয় কৃষি পদক পান।
লিচু কিতাব জানান, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবার ঈশ্বরদীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। দামও বেশ ভাল পাচ্ছেন লিচু চাষীরা। গত বছর লিচুর ফলন বিপর্যয়ের কারণে কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছিল তা এবছর পুষিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত বছর ফলন কম হলেও দাম ছিল তুলনামুলক বেশি।
তিনি আরও বলেন, তাঁর তিনটি বাগান মিলে ২’শ লিচু গাছ রয়েছে। গত বছর লিচুর ফলন তেমন না হলেও এবছর প্রায় প্রত্যেকটি গাছেই বেশ ভাল ফলন হয়েছে। গত বছর প্রায় ৫ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করলেও এবছর প্রায় ২০ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে পারব বলে মনে হচ্ছে। তার বাগানে উৎপাদিত লিচু ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জেলাতেই পাঠানো হয়। সব চেয়ে আশার কথা হলো, ঈশ্বরদীর উৎপাদিত লিচু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ক্যানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাভাবে পাঠানো হয়। সেসব দেশেও ঈশ্বরদীর উৎপাদিত লিচুর বেশ সুনাম রয়েছে।
কোলেরকান্দি এলাকার লিচু চাষী আহমদুল্লাহ্ মিলন জানান, তাঁর লিচুর বাগানে গত বছরের তুলনায় এবছর অনেক বেশি লিচু হয়েছে। গত বছর ফলন কম হলেও এছর বেশ ভাল ফলন হয়েছে। দাম ভাল হওয়ায় গত বছরের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, গত বছর ফলন কম হলেও প্রতি হাজার লিচু বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায়। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় দ্বিগুন-তিনগুন দাম। এবছর সেই লিচু বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায়। ফলন বেশি হওয়ায় দাম নিয়ে কৃষক বেশ খুশি বলেও জানান তারা।
নানা কারণে গত তিন বছর লিচু নিয়ে ঈশ্বরদীর হাজার হাজার লিচু চাষী চরম বেকায়দায় পড়েছিলেন জানিয়ে মানিকনগর গ্রামের লিচু চাষী আব্দুল হক জানান, তার তিনটি বাগান থাকা সত্বেও তিনি আরও দুইটি বাগান কিনেছেন। তার ৫টি বাগানে মোট লিচু গাছের সংখ্যা প্রায় ২’শ। তিনি প্রায় ২০ লাখ লিচু বিক্রি করবেন বলেও জানান। সব কিছু অনুকুলে থাকলে এবার বেশ লাভ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চরমিরকামারী গ্রামের লিচু চাষী হাবিবুল ইসলাম মালিথা জানান, তার বাগানেও একই অবস্থা। গত বছর লিচুর ফলন বিপর্যয় হলেও এবার বেশ বাম্পার ফলন হয়েছে। লিচুর আবাদের উপর ভিত্তি করেই তার সংসার চলে জানিয়ে এবার লিচুর ফলন ভাল হওয়ায় আগামী বছর তার পরিবার নিয়ে বেশ ভাল যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঈশ্বরদীতে আবাদকৃত লিচুর মধ্যে আঁটি লিচু, চায়না-তিন চার, বেদানা, বোম্বাই লিচু উল্লেখযোগ্য। ঈশ্বরদীর সাহাপুর, ছলিমপুর, দাশুড়িয়া, মিরকামারী, ছিলিমপুর, জয়নগর, মানিক নগর, ভাড়ইমারী, বক্তারপুর, জগন্নাথপুর, শেখেরদাইড় সহ প্রায় সকল এলাকাতেই মাটির উর্বরতার কারণে লিচু সুস্বাদু ও উন্নতমানের হয়ে থাকে। অন্যান্য এলাকার চেয়ে এখানকার লিচু দেশী-বিদেশী সকল ধরনের ক্রেতার কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
মৌসুমের শুরুতেই ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে আগাম বাগান কিনে নিজের সন্তানের মতো পরিচর্যা করায় প্রতিটি বাগানেই বাম্পার ফলন হয়েছে। ঈশ্বরদীর বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সুস্বাদু ফল ও বেশি দামের কারণে প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় লিচু গাছ লাগিয়ে সবুজের গ্রামও সৃষ্টি করা হয়েছে।
লিচু কেনার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, ভোলা, বরিশাল সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ব্যাপারী ও পাইকাররা এসেছেন ঈশ্বরদীতে। তারা বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, লিচু চাষীর বাড়িতে থেকে লিচু কিনে চলে যাচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায়। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন। লিচু কেনা-বেচার জন্য ঈশ্বরদীর জয়নগর শিমূল তলা, বোর্ড অফিস মোড়, দাশুড়িয়া, আওতাপাড়া সহ বিভিন্ন এলাকায় লিচু হাট বসে। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে জমজমাট কেনা-বেচা। ক্রেতা-বিক্রেতার পদভারে মুখোরিত হয় হাট এলাকা। আবার লিচু গাছ থেকে পেরে তা বাছাই করার জন্যও লিচু চাষীদের বাড়িতে এখন আত্মীয় স্বজনদের প্রচন্ড ভীড়। মেয়ে-জামাই ও নাতি-নাতনিদের পদভারে মুখোরিত লিচু চাষীর বাড়ির আঙ্গিনা।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন জানান, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবার লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর ফলন ভাল না হলেও এবছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। লিচুর দাম বেশ ভাল হওয়ায় কৃষকদের ক্ষতি অনেকটাই লাঘব হবে মন্তব্য করে তিনি আরও জানান, লিচু আবাদ সহজলভ্য হওয়ায় প্রত্যেক বছরই এখানে পেশাদার লিচু চাষীর বাইরেও কিছু কিছু মানুষকে লিচু চাষ করতে দেখা যাচ্ছে। গত বছরের চেয়ে এবার ঈশ্বরদীতে প্রায় ২০০ হেক্টর বেশি জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে অন্তত ৭০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ঈশ্বরদীতে। শেষ পর্যন্ত টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ঈশ্বরদীতে এ মৌসুমে মোট প্রায় সাড়ে ৭ লাখ গাছের মধ্যে শতকরা ৮০-৮৫ ভাগ গাছে লিচুর উৎপাদন হয়েছে। এতে ঈশ্বরদী এলাকায় এবার প্রায় ১২ হাজার কৃষক ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ করে প্রায় ৭শ’ কোটি টাকার লিচু উৎপাদনের আশা করছেন।