সর্বশেষ সংবাদ :

ঐতিহ্যের পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে ঘানির কারিগরও

স্টাফ রিপোর্টার, জয়পুরহাট: ভোরের আলো ফোটার আগেই এক সময় জয়পুরহাটের বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে ঘুরত কাঠের ঘানি। গরু কিংবা কারিগরের শ্রমে সরিষা ভেঙে তৈরি হতো তেল। সেই তেল বিক্রির আয়েই চলত অনেক পরিবারের সংসার। বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছিল ঘানি চালানোর পেশা। তবে কালের বিবর্তনে সময়ের সাথে বদলে গেছে সেই চিত্র। বয়সের ভারে পুরোনো কারিগরেরা এখন ঘানির কাজ ছাড়ছেন।
বেশ কয়েকজন ঘানি মালিক ও কারিগরের সাথে আলাপকালে জানা যায়, নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সেই সাথে সরিষা, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় ঘানি চালিয়ে আগের মতো লাভও হচ্ছে না। ফলে আক্কেলপুরে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানি এখন টিকে আছে হাতে গোনা কয়েকজন মালিক ও কারিগরের চেষ্টায়।
ঘানি মালিক ও কারিগরদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে আক্কেলপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০টি ঘানি চালু ছিল। বিগত ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২১টিতে। ২০২১ সালে ছিল ১২টি। আর চলতি বছরে নিয়মিত চলছে মাত্র ৮টি। অর্থাৎ দেড় দশকে বন্ধ হয়ে গেছে ২২টি ঘানি। হিসাবে, এই সময়ে প্রায় ৭৩ শতাংশ ঘানি বন্ধ হয়েছে।
ঘানি মালিকেরা বলছেন, কাঠের ঘানিতে তৈরি সরিষার তেলের আলাদা চাহিদা রয়েছে। স্বাদ, গন্ধ ও ঐতিহ্যের কারণে অনেক ক্রেতাই এই তেল কিনতে আগ্রহী। কিন্তু বোতলজাত ও আধুনিক যন্ত্রে উৎপাদিত তেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একটি ঘানিতে দিনে গড়ে ১০০ কেজি বা তার বেশি সরিষা ভাঙানো হয়। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি কেজি সরিষা ৯৫ টাকা হিসাবে ১০০ কেজি সরিষা কিনতে খরচ হয় ৯ হাজার ৫শত টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ৬০০ টাকা, বিদ্যুৎ ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে ৪০০ টাকা এবং পরিবহন সহ অন্যান্য খরচ ৩০০ টাকা। সব মিলিয়ে মোট খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার ৮০০ টাকা।
প্রতি ১শত কেজি সরিষা থেকে গড়ে ৪২ কেজি তেল পাওয়া যায়। প্রতি কেজি ২০০ টাকা দরে তেল বিক্রি করে আয় হয় ৮ হাজার ৪০০ টাকা। পাশাপাশি প্রায় ৫০ কেজি খৈল ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে পাওয়া যায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা। তেল ও খৈল মিলিয়ে মোট আয় দাঁড়ায় ১০ হাজার ১৫০ টাকা। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী ১০০ কেজি সরিষা ভাঙিয়ে লাভ থাকে মাত্র ৬৫০ টাকা।
আক্কেলপুর উপজেলার তুলসীগঙ্গা নদীঘেঁষা এলাকায় ঘানি চালান আলমগীর হোসেন বলেন, আমার দাদা এই ব্যবসা করতেন। বাবাকেও এই কাজ করতে দেখেছি। সেই সূত্রে আমিও বিগত ১৯৯৫ সাল থেকে ঘানি চালাচ্ছি। আগের তুলনায় সরিষার দাম, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তেলের দাম বাড়ানো যায় না। অনেক সময় ঘানি চালিয়ে খরচ উঠিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু ঘানি কমছে না, কমছে এ পেশার কারিগরও। কারিগরের সংকটের চিত্রও স্পষ্ট।
বর্তমানে আক্কেলপুরে চালু থাকা ৮টি ঘানির ১১ জন কারিগরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাঁদের নয়জনের বয়স ৪৫ বছরের বেশি। ৫ জনের বয়স ৫৫ বছরের ওপরে। ৩০ বছরের নিচে বয়সী কারিগর রয়েছেন মাত্র একজন। এতে ভবিষ্যতে ঘানি চালানোর জন্য দক্ষ কারিগর পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কারিগর মজিবর রহমান বলেন, আগে বংশপরম্পরায় এই কাজ শেখার প্রচলন ছিল। দিনে আট থেকে দশ ঘণ্টা কাজ করেও আয় সব সময় নিশ্চিত নয়। অন্য কাজ করলে তুলনামূলক বেশি আয় করা যায়। তাই নতুন প্রজন্ম ঘানির কাজে আগ্রহী হচ্ছে না। শুধু কারিগর নয়, ঘানির কাঁচামাল সরিষা সংগ্রহেও সমস্যায় পড়ছেন মালিকেরা। স্থানীয়ভাবে ২০ জন সরিষা চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের ১৪ জন সরিষা সরাসরি ঘানি মালিকদের কাছে বিক্রি করেন না। বেশির ভাগ সরিষাই মাঠ পর্যায় থেকে পাইকারেরা কিনে নেন।
সরিষাচাষি লুৎফর রহমান বলেন, সরিষা চাষ করে ভালো ফলন পেলেও আমাদের কাছে ন্যায্য দাম পাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। ঘানি মালিকেরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরিষা কিনলে আমরা যেমন ভালো দাম পেতে পারি, তেমনি তাঁদেরও পরিবহন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের খরচ কমতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় পাইকারেরা মাঠ থেকেই সরিষা কিনে নেওয়ায় ঘানি মালিকদের কাছে সরাসরি বিক্রির সুযোগ হয় না।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছর আগে আক্কেলপুরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। পরের বছর বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের কারণে তা কমে প্রায় এক হাজার ৬০০ হেক্টরে নেমে আসে। অনুকূল আবহাওয়া না থাকায় অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ে সরিষা আবাদ করতে পারেননি। ফলে কমে যায় আবাদি জমির পরিমাণ। তবে চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সরিষার আবাদ ও উৎপাদন-দুটিই বাড়বে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ এমরান হোসেন বলেন, সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষার ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক স্থানীয় ঘানি বা তেল উৎপাদনকারীর কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ পেলে উভয় পক্ষই উপকৃত হবেন। ঘানি শিল্প টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
এ ব্যাপারে জয়পুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঘানি শিল্প টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারজাতকরণ ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঘানি মালিকদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অনলাইন মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আর্থিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণে প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হবে।


প্রকাশিত: September 20, 2026 | সময়: 3:44 am | সুমন শেখ