, , ।
মিজানুর রহমান, চারঘাট: একসময় কর্মচাঞ্চল ছিল রাজশাহীর চারঘাটের খয়ের শিল্প। গড়ে উঠেছিল প্রায় শতাধিক খয়ের তৈরীর কারখানা। এসব কারখানাকে ঘিরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় হাজারো শ্রমিকের। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি ক্রেতারা আসতেন চারঘাটের খয়ের হাটে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। একসময়ের সম্ভাবনাময় ও ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সরেজমিনে গিয়ে খয়ের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একসময় চারঘাট উপজেলার গোপালপুর, বাবুপাড়া, পিরোজপুর, ঝিকরা এলাকায় গড়ে উঠেছিল শতাধিক কারখানা। এসব কারখানায় স্থানীয় অসংখ্য শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছিল। খয়ের উৎপাদন ও বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে জমে উঠতো চারঘাটের হাট-বাজার। দুর দুরান্ত থেকে ক্রেতারা এসে এখান থেকে খয়ের কিনে নিয়ে যেতেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু বর্তমানে সেই কর্ম চাঞ্চল্য আর নেই। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন চারঘাটে মাত্র ৫-৬টি খয়ের কারখানা কোনাভাবে চালু রয়েছে। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, খয়ের শিল্পের প্রধান কাঁচামাল খয়ের গাছের স্বল্পতা বর্তমানে এ শিল্পের অন্যতম বড় সংকট। পাশাপাশি রয়েছে দক্ষ ও প্রয়োজনীয় শ্রমিকের অভাব। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
তারা বলেন, খয়ের শিল্প ছিল চারঘাটের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। কারখানাগুলো চালু থাকায় অনেক পরিবার সরাসরি এর উপর নির্ভরশীল ছিল। খয়ের হাটকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্যেও ছিল প্রাণ চাঞ্চল্য। কিন্তু কাচাঁমাল এর সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা মালিক ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
শ্রমিকদেরও রয়েছে নানা দুর্ভোগ। কারখানা কমে যাওয়ায় নিয়মিত কাজের সুযোগ কমেছে। ফলে অনেক শ্রমিক জীবিকার জন্য অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা খয়ের তৈরির ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে।
খয়ের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইব্রাহিম বলেন, খয়ের শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই বিলুপ্তির হাত থেকে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে রক্ষা করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। তাদের প্রত্যাশা, যথাযথ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ পেলে চারঘাটের হারিয়ে যেতে বসা খয়ের শিল্প আবারও তার পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।
সরকারী উদ্যোগে খয়ের গাছের চাষ ও সংরক্ষণ, কারখানার মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদিত খয়েরের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এ শিল্পকে আবারও ঘুরে দাড় করানো সম্ভব পাশাপাশি একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহন করা প্রয়োজন বলে জানান থানাপাড়া সোয়ালোজের নির্বাহী পরিচালক রায়হান আলী।
রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সাংসদ আবু সাইদ চাদঁ বলেন, খয়ের শিল্প রক্ষায় খয়ের গাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সহযোগিতা ও সরকারী ভাবে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করা হবে। এ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে চারঘাটের খয়ের শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।