শনিবার, ৪ঠা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্পোর্টস ডেস্ক: ম্যাচের শেষ বাঁশিটা যখন বাজল, তখন হয়তো শুধু পর্তুগালের উল্লাসধ্বনিই শোনা যাচ্ছিল না, ফুটবল বিধাতা নিজে অলক্ষ্যে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চে পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলের সেই হৃদয়ভাঙা পরাজয় কেবল ক্রোয়েশিয়ার টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার গল্প নয়, এটি আসলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক সোনালী মহাকাব্যের শেষ পাতা।
৪০ বছর বয়সে এসে, জাতীয় দলের সেই চেনা লাল-সাদা চেকার্ড জার্সিটা চিরতরে তুলে রাখার ঘোষণা দিলেন লুকা মদ্রিচ। যে জার্সি গায়ে জড়িয়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে তিনি ফুটবল বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন, সেই জার্সির শেষ ছোঁয়াটা লেগে রইল একরাশ আক্ষেপ আর কান্নায়।
বিদায়ের ক্ষণে পরিসংখ্যান হয়তো বলবে, তিনি ক্রোয়েশিয়ার হয়ে রেকর্ড ২০১টি ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন ২৯টি গোল। কিন্তু লুকা মদ্রিচকে কি কখনো স্রেফ সংখ্যার ফ্রেমে বাঁধা যায়? তিনি তো ছিলেন মাঠের এক কবি, যার পায়ের জাদুতে ফুটবল হয়ে উঠত নিখাদ শিল্প।
মাঝমাঠের বৃত্তে দাঁড়িয়ে যেভাবে তিনি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন, যেভাবে বুটের বাইরের অংশ দিয়ে চোখের পলকে নিখুঁত পাস বাড়াতেন, তা ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
মদ্রিচের এই বিদায় আসলে এক রূপকথার সমাপ্তি। বলকান যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে, সাইরেনের আওয়াজ আর বোমাবর্ষণের মাঝে শরণার্থী শিবিরের কংক্রিটের চাতালে যে ছেলেটি ফুটবলকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল; সেই ছেলেই একদিন ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন।
২০১৮ সালের রাশিয়ায় একার কাঁধে এক রূপকথার জন্ম দিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবারের মতো নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপের ফাইনালে, জিতেছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের ‘গোল্ডেন বল’। আর সেই বছরই ফুটবল গ্রহের দুই মহাজাগতিক শাসক, মেসি ও রোনালদোর এক দশকের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে কেড়ে নিয়েছিলেন ফুটবলারদের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্যালন ডি’অর’। ২০২২ সালেও তার জাদুকরি নেতৃত্বেই ক্রোয়াটরা বিশ্বমঞ্চে সেমিফাইনাল খেলেছিল।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্লাব ফুটবলের সম্ভাব্য সব ট্রফি জিতলেও, মদ্রিচের আসল সত্তা লুকিয়ে ছিল ক্রোয়েশিয়ার ওই ১০ নম্বর জার্সিতে। যেখানে তিনি শুধু একজন অধিনায়ক ছিলেন না, ছিলেন একটা আস্ত দেশের আশা-ভরসা আর আবেগের বাতিঘর।
পর্তুগাল ম্যাচের পর যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তার সেই ভেজা চোখ আর ক্লান্ত অবয়ব দেখে কোটি ফুটবল ভক্তের বুক ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ট্রফি ক্যাবিনেটে হয়তো একটা বিশ্বকাপ ট্রফি অপূর্ণই থেকে গেল, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি যে সিংহাসন পেতেছেন, তা কোনো ট্রফির চেয়ে কম নয়। ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস অনেক কিংবদন্তি দেখবে, কিন্তু লুকা মদ্রিচের মতো এমন নিঃশব্দ ও নিখুঁত জাদুকর আর কখনো পাবে না!