শনিবার, ৪ঠা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সানশাইন ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এক শক্তি-সমীকরণ গড়ে উঠছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি অনানুষ্ঠানিক আঞ্চলিক জোটে যুক্ত হয়েছে কাতার, মিসর, তুরস্ক ও পাকিস্তান। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই জোটের বাইরে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েল—উভয়ের প্রভাব মোকাবিলায় ভিন্ন কৌশল গ্রহণের কারণেই এই নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষণধর্মী সংবাদমাধ্যম ‘ফরেন পলিসি’-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে—কোনো আনুষ্ঠানিক নাম না থাকলেও ইসরায়েলি গণমাধ্যমে এই জোটকে ‘সুন্নি জোট’ বা ‘বর্ধিত ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। জোটটির মূল লক্ষ্য দুটি—প্রথমত, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা এবং সিরিয়া ও লেবাননের মতো দেশে হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধার করা। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সীমা নির্ধারণে আঞ্চলিক চাপ সৃষ্টি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ, বিশেষ করে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস সদস্যদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানের পর উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও তুরস্কও আগের তুলনায় কাছাকাছি আসে। এই জোটে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একসময় আরব বসন্ত-পরবর্তী সময়ে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত আঞ্চলিক নীতিতে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দুই দেশের অগ্রাধিকার বদলেছে। আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথেই এগোতে চায়। অন্যদিকে সৌদি আরব এখন এমন দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, যারা ইসরায়েলের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সমালোচনামুখর।
এই জোটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্বের অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে রিয়াদ। ইতিমধ্যে আরব আমিরাত ও ইরানকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের পরিকল্পনাও করেছে সৌদি আরব। তবে সেটি কবে হবে কিংবা আরব আমিরাত তাতে অংশ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে, তবে অর্থনৈতিকভাবে দেশটি কিছুটা লাভবানও হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সৌদি আরবের রপ্তানি আয় বেড়েছে এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লোহিত সাগরমুখী ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে তেল উৎপাদনে সাময়িক বিঘ্ন ঘটায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে কাতার এই সংকটে নিজেকে দক্ষ কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ইরানের সঙ্গে তুলনামূলক ভালো সম্পর্ক থাকায় যুদ্ধবিরতির আলোচনায় কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও ইরানি হামলায় কাতারে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি স্থাপনা ‘রাস লাফফান’ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির গ্যাস রপ্তানি সক্ষমতাও কমে যায়।
এই নতুন জোট থেকে অন্য সদস্যরাও লাভের আশা করছে। সৌদি বিনিয়োগে অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ দেখছে মিসর, নিরাপত্তা উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে অস্ত্র রপ্তানি বাড়াতে চায় তুরস্ক, আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি অর্জনের চেষ্টা করছে পাকিস্তান।
অন্যদিকে আরব আমিরাত সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে। দেশটি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফুজাইরাহ ও ওমান উপসাগরীয় বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করেছে। যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের কাছ থেকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তাও পেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য এখন কার্যত দুই ভিন্ন কৌশলগত শিবিরে বিভক্ত। একদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন দেশগুলো ইরান ও ইসরায়েল—উভয়ের প্রভাব সীমিত রাখতে চায়। অন্যদিকে আরব আমিরাত ইরানকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই বিভক্তিই আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।