, , ।
মওদুদ আহম্মেদ, আক্কেলপুর: ৬৫ বছরের দিনমজুর নুর ইসলাম। আক্কেলপুর পৌরসভার বিহারপুর নয়াপাড়ায় টিনের একটি মাত্র খুপরি ঘরে স্ত্রী, পঙ্গু ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে ছয়জনের সংসার তার। আধুনিকতার আলো যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন তাদের ঘরেই ঘন অন্ধকার। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে রাত নামলেই ডুবে যেত নিস্তব্ধ অন্ধকারে। মোমবাতির আলোয় শিশুরা পড়ত, পঙ্গু রব্বানী তাকিয়ে থাকত শূন্যে, কবে আলো আসবে তাদের ঘরে।
পাশের রাজকান্দা ময়েনপাড়ার ৭৮ বছরের বৃদ্ধ ইদ্রিস আলী বুদার অবস্থাও ভিন্ন ছিল না। গ্রামের অন্য ঘরে ২৬ বছর আগে বিদ্যুৎ এলেও তিনি পাননি সংযোগ। বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার সামর্থ না থাকায় সংযোগ দেওয়া হয়নি তাকে। স্ত্রীকে নিয়ে জীর্ণ মাটির ঘরে কুপিবাতির ধোঁয়া সহ্য করে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো। খড়ি কেটে বাজারে বিক্রি করে কোনোমতে চালাতেন সংসার। শেষ বয়সে দুই পরিবারই ডুবে ছিল সেই পুরোনো অন্ধকারে।
কিন্তু তাদের সেই অন্ধকার ভেদ করে আলো জ্বালালেন রাজকান্দা গ্রামের সৃজনশীল মানুষ জহুরুল ইসলাম। তিনি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক পদে আছেন। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুই পরিবারের ঘরে অবশেষে জ্বলে উঠেছে বহু প্রতীক্ষিত বিদ্যুতের বাতি, যা শুধু ঘর নয়, আলোকিত করেছে তাদের জীবনও।
দুই দশকের অন্ধকারে নুর ইসলামের পরিবার: সরেজমিনে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আক্কেলপুর উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নুর ইসলাম ও ইদ্রিস আলীর এই দুইটি ঘরে পৌঁছায়নি সেই আলো। নুর ইসলাম স্থানীয় মিহির দাসের এক টুকরো জায়গায় টিন দিয়ে খুপরি ঘর করে থাকেন। ছেলে রব্বানী রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে সানসেটের আঘাতে দুই পায়ের তালু ক্ষতবিক্ষত হয়। চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। সংসারে আয় বলতে কিছুই নেই। বিদ্যুৎ নেওয়া ছিল তার স্বপ্নেরও বাইরে।
চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক নিয়ে নিজ ভাষায় নুর ইসলাম বলেন, অভাবের সংসারে কারেন্ট লিমু কিভাবে। ছেলের চিকিৎসায় সব ট্যাকা শ্যাষ। হামার কষ্ট দেখে জহুরুল ভাই ২৫০০ ট্যাকা খরচ করে মোর ঘরত কারেন্ট লিয়ে দিসে। মোর ঘর আজক্যা আলোতে ফকফকা হছে।
২৬ বছর কেরোসিনের ধোঁয়ায় জীবন কাটালেন ইদ্রিস আলী: ইদ্রিস আলীর একমাত্র মেয়ে পলির বিয়ে হয়েছে ২০ বছর আগে পাশের গ্রামে। জীবনের শেষ বয়সে স্ত্রী মিনা বেগমকে নিয়ে বসে থাকতেন ক্ষীণ আলোয় কুপিবাতির সামনে। ধোঁয়া, কালি চোখে উঠে পানি আসলেও করার কিছু ছিলনা তার।
বৃদ্ধ ইদ্রিস আলী বলেন, এখন বয়স হইছে। চোখে কম দেখি। ল্যাম্প জ্বালাইলে ধোঁয়া আর কালি উঠে চোখে মুখে লাগে। অন্ধকারে বসে আকাশের দিকে তাকাইয়া ভাবতাম আর ভাবতাম কবে আলো আসবে ঘরে। আল্লাহ হামাক দেখছে। জহুরুল ভাই নিজের ট্যাকা দিয়া কারেন্ট এনে দিছে। মুই খুব খুশি।
যেদিন প্রথম জ্বলে উঠল আলো: শনিবার বিকেলে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নুর ইসলামের ঘরে নতুন লাগানো সুইচ চাপতেই প্রথমে সামান্য ঝিলিক তারপর স্থির আলো। সেই আলোয় নুর ইসলামের চোখ ভিজে আসে। পঙ্গু রব্বানীও খিলখিল করে হাসে, যে হাসি বহুদিন দেখেনি প্রতিবেশীরা। পুরো মহল্লায় ছোটখাটো উৎসবের আমেজ।
কিছু পর ইদ্রিস আলীর ঘরেও জ্বলে ওঠলো আলো। কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন বৃদ্ধ। তারপর মুখে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে স্বস্তির হাসি, যেন জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও ফিরে পেলেন নতুন সকাল।
স্থানীয় জহুরুল ইসলাম বলেন, একদিন বাজারে ইদ্রিস আলী বুদা চাচা কেরোসিন তেলের টাকা চাইছিলেন। তেল কিনে দিয়ে জানলাম তার ঘরে নাকি বিদ্যুৎ নেই। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি নুর ইসলামের ঘরেও একই অবস্থা। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, নিজ খরচে তাদের ঘরে বিদ্যুৎ দেব। সেই থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ঘরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দেই।
পৌরসভার সাবেক মেয়র আলমগীর চৌধুরী বাদশা বলেন, বিগত সরকার দুই পরিবারকে বঞ্চিত রেখে এ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত ঘোষণা করেছে। এটা হতাশাজনক। তারা দরিদ্র বলে বিদ্যুৎ বিল দিতে পারবে না, এই অজুহাতে বছরের পর বছর অন্ধকারে রেখেছে তাদের। স্থানীয় জহুরুল ইসলাম এগিয়ে এসে যে মানবিক কাজটি করেছেন এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর জোনাল অফিসের ডিজিএম আব্দুর রহমান বলেন, স্থানীয় জহুরুল ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরে খোঁজ নিয়ে দ্রুততার সাথে ওই দুইটি পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। আর কেউ যেন বিদ্যুৎ সেবার বাহিরে না থাকে আমরা সেই লক্ষে কাজ করছি।