বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার, গোদাগাড়ী: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পুলিশের এক পরিদর্শক ও উপপরিদর্শকের কার্যক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন মানুষ। এ দুজন গোদাগাড়ীর প্রেমতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত। এই তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসএম মাকসুদুর রহমান ও এসআই বরন সরকার সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে যাচ্ছেন। টাকা ছাড়া তারা কিছুই বোঝেন না। অভিযোগ পেলেই করেন পক্ষপাতিত্ব। এ নিয়ে জেলার পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে লিখিত অভিযোগ হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিদর্শক মাকসুদুর রহমানের আস্কারায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এসআই বরন সরকার। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা তোলা, আওয়ামী দোসর বানিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের মতো অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। ইনচার্জ মাকসুদুর প্রায় সব অভিযোগই তদন্তের দায়িত্ব দেন এসআই বরন সরকারকে। আর অভিযোগ পেলেই অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একটি পক্ষের হয়ে অবস্থান নেন বরন সরকার। বরনের মোবাইল ফোন থেকে কথা বলার সময় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একজন সদস্য এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, এমন ফোনকল রেকর্ডও পাওয়া গেছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মামলা কিংবা গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে এ দুই পুলিশ কর্মকর্তা প্রচুর টাকা কামিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক ও গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হযরত আলী বলেন, ‘বরন সরকার মানুষের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে। প্রেমতলী-বসন্তপুর রাস্তায় চলাচল করা সাধারণ মানুষকেও রাতের বেলা তল্লাশির নামে হয়রানি করেন। বিভিন্নভাবেই শুনছি যে এরা মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে। ওসিকে জানিয়েছি।
ওসিও বলেছেন, তাদের খারাপ আচরণের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ওপরে জানাবেন। কিন্তু কী জানিয়েছেন জানি না। এখনও তাদের এ রকম কার্যক্রম চলছে।’
উপজেলার বড়গাছি গ্রামের আজিজুল হাসান নামের এক ব্যক্তি জানান, সম্প্রতি মাটিকাটা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য উকিল আলীর ভাই নবাব আলী তাকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মারধর করেন। এ ব্যাপারে তিনি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে অভিযোগ দিলে ইনচার্জ মাকসুদুর রহমান তা তদন্তের দায়িত্ব দেন এসআই বরন সরকারকে।
গত সোমবার দুপুরে বরন সরকারের মোবাইল ফোন থেকে তার কাছে একটি কল আসে। তখন এসআইয়ের ফোন থেকে কথা বলেন ইউপি সদস্য উকিল। অভিযোগ দেওয়ায় উকিল তার ওপর চড়াও হন এবং তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন।
আজিবুল বলেন, ‘হুমকি দেওয়ার রেকর্ড আমার কাছে আছে। পুলিশের মোবাইল ফোন থেকে ফোন করে প্রতিপক্ষ এভাবে হুমকি দেবে, এটা তো হতে পারে না। তার মানে পুলিশ একটি পক্ষের হয়ে অবস্থান নিয়েছে। আমি তো এখন ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করতে পারি না।’
দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন বিদিরপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসা মোড়ের বাসিন্দা তৈয়বুর রহমানও। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি একটা জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আমাদের ডেকেছিল। যাওয়ার পরে অপেক্ষা করতেই থাকি, কিন্তু ইনচার্জ আসছিলেন না। ফোন করলাম। তিনি ভালোভাবেই কথা বলে এলেন। আসার সঙ্গে সঙ্গে বরন সরকার কানে তার কানে কী যেন বললেন। তারপর দুজনে মিলে আমাদের সাথে এত বাজে এবং নোংরা ব্যবহার করলেন তা বলার মতো না। মনে হচ্ছিল, সম্পত্তি তাদের পৈত্রিক, কাগজপত্রের কোন দাম নেই।’
সম্প্রতি উপজেলার হরিশংকরপুর গ্রামের গোলাম হাসান নামের এক ব্যক্তি পরিদর্শক মাকসুদুর রহমান ও এসআই বরন সরকারের বিরুদ্ধে জেলার পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।
তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, তিনি গত ১৮ জুলাই নিজের জমিতে গাছ লাগাচ্ছিলেন। এ নিয়ে আরিফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তার নামে তদন্ত কেন্দ্রে অভিযোগ করেন। এর প্রেক্ষিতে পুলিশ উভয়পক্ষকে বিকেলে তদন্ত কেন্দ্রে ডাকে। পুলিশের ডাকে তিনি সময়মতো তদন্ত কেন্দ্রে হাজির হন, কিন্তু অভিযোগকারিই যাননি।
অভিযোগে তিনি বলেন, ‘দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর আমি বিষয়টি তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসএম মাকসুদুর রহমান ও এসআই বরন সরকারকে বিষয়টি জানাই। এ সময় বরন সরকার আরিফুলের পক্ষ নিয়ে আমাকে বিভিন্ন ভয়ভীতি ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে বলেন, ‘জমিতে আর যাবি না, গেলে তোকে লকাপে ভরে মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেব।’ বর্তমানে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি। কারণ, সে পুলিশকে ম্যানেজ করে ফেলেছে।’
অভিযোগে আরও বলা হয়, ‘ইনচার্জ এসএম মাকসুদুর রহমান ও এসআই বরন সরকার মাদকদ্রব্যের গডফাদারের সঙ্গে ওঠাবসা করেন এবং কেউ তাদের কথা না শুনলে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেন। তারা যেদিকে টাকা পান, সেদিকেই ঢলে পড়েন। ফলে জনসাধারণ বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক ন্যায়বিচার পাচ্ছে না।’ তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সবশেষ বুধবার ৩০ জুলাই দুপুরে কৃষ্ণবাঢি গ্রামে নারীদের ঝগড়া নিয়ে অভিযোগ পেয়ে সেখানে যান এসআই বরন সরকার। সেখানে একটি পক্ষের হয়ে অন্য পক্ষকে শাসাচ্ছিলেন। এ সময় গ্রামের মানুষের তোপের মুখে পড়েন এসআই বরন সরকার। পরে সেখান থেকে পালিয়ে যান এসআই বরন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই বরন সরকার বলেন, ‘আমি কাউকে গালাগালি করি না। আমার ফোন থেকে কাউকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সঠিক না।’ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তোলা বা আওয়ামী লীগের দোসর বানিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।’
আর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক এসএম মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে সেগুলো ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। কাউকে ভয়ভীতি দেখানোর সুযোগ নেই।’
রাজশাহীর এসপি ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘লিখিত অভিযোগটা এখনও দেখা হয়নি। আর যেসব অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে, এগুলো হলে তো খারাপ। পুলিশের ফোন থেকে কেউ হুমকি দেবেন, এটাও তো হয় না। অভিযোগগুলো এলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।