পাল্টায়নি বেদের বহর অধরা আধুনিকতা

মুক্তার হোসেন : আগের পেশা ধারণ করেই জীবিকা নির্বাহ করছে বেঁদে পরিবার । গ্রামগঞ্জে সাপ ধরা, সাপ খেলা দেখানো তাবিজ কবজ বিক্রি ও শরীরে সিংগা লাগিয়ে যত সামান্য আয় করে চলছে তাদের জীবন সংসার। সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের পেশার আর কদর নেই । ছোট খাটো অন্য পেশাতে যুক্ত হচ্ছেন অনেকে। তবে দেশ স্মার্ট বাংলাদেশে প্রবেশ করায় এ পেশা আর কাম্য নয়। তারা আমাদের সমাজেরই অংশ । তাদের বাদ দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তাদের জীবন যাপন আর দশটি পরিবারের মত নয়। তাদের নেই পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, থাকার জায়গা, স্বাস্থ্য পরিচর্চা, ভালো পোশাক ও চিত্ত বিনোদনসহ অনেক কিছু থেকে তারা বঞ্চিত। মৌলিক চাহিদার সবকিছুতেই যেন বড় ধরনের একটা ঘাটতি দেখা যায় তাদের মধ্যে । এরা এক জায়গায় বেশী দিন অবস্থান না করায় এদের শিশুরা হচ্ছে শিক্ষা বঞ্চিত। এছাড়া মানসম্মত খাবারও জোটেনা এসব শিশুদের মুখে। কোনও রকম দিনাতিপাত করে পলিথিনের ঝুপড়িতে রোদ বৃষ্টি কর্দমাক্ত পরিবেশেই বেড়ে উঠে এদের শিশু সন্তানরা। এদের ভাগ্যউন্নয়নে সরকার ও সামাজিক সংগঠন দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এমনটায় আশা সমাজ বিশিষ্টজনদের ।
জানা যায়, প্রায় চারশত বছর আগে ১৬৩৮ সালের দিকে আরকান রাজ বল্লাল রাজার সাথে স্মরনার্থী হয়ে এ বাংলার মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে প্রথম বসবাস শুরু করে বেঁদে পরিবার। পরে এরা মুসলিম ধর্মে দিক্ষা নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে । বেঁদেরা বাংলা ও ভারতের যাযাবর একটি গোষ্ঠি । বেঁদেরা গ্রাম গঞ্জে ঘুরে ঘুরে সাপ ধরা, সাপের বিষ নামানো, সাপ খেলা, তাবিজ কবজ বিক্রি, শরীরে সিংগা লাগিয়ে বিষ ব্যাথা দূর করাসহ নিজেদের কৌশল প্রদর্শন করে জীবিকা নির্বাহ করে । বেঁদে পরিবার যাযাবর হওয়ায় তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা বঞ্চিত হয়। আর এ কারণে তারা জীবিকা হিসেবে পূর্ব পুরুষের পেশাকেই বেছে নেন । বেঁদে পরিবারের জীবন সংসার চলে নদীর সেই ভাসমান নৌকাতে। সেই ভাসমান নৌকায় তাদের বসবাসের ঘরবাড়ি । সেখানেই চলে তাদের রান্না বান্না থাকা খাওয়া বিয়ে পার্বণসহ সামাজিক নানা অনুষ্ঠান । বর্তমানে দেশের অনেক নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এখন তারা বিভিন্ন যানবাহনে করে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকাতে বহর নিয়ে যায়। সেখানে তারা নদীর ধার কোনও ভিটেমাটি কিংবা কোনও খাস জায়গায় অবস্থান নেই । এরা অস্থায়ী পলিথিনের ঝুপড়ি করে বসবাস করে । যেখানে নৌকার বহর নিয়ে যায় সেখানে তারা নৌকা সাড়িবদ্ধভাবে বেঁধে রেখে বসবাস করে । এক দেড় মাসের বেশী সময় তারা কোন জায়গায় অবস্থান করেন না। এরা ১৮ থেকে ২০টি পরিবারের বহর নিয়ে তারা সরদারের নির্দেশনায় চলাফেরা করে । বেঁদে বহর এক জায়গায় বেশীদিন অবস্থান না করায় তাদের যাযাবর বলা হয়।
সম্প্রতি নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর ধারে দেখা মেলে এক বিশাল বেঁদে বহর। সেখানকার এক বেঁদে সরদার আবু সুফিয়ান জানান, একটি বেঁদে বহরে ১৫ থেকে ২০টি পরিবার থাকে । সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন সদস্য নিয়ে পলিথিনের ঝুপড়িতে অনেক কষ্টে বসবাস করে । তিনি জানান সকাল হলে সকলেই কাজে বের হয়ে যায় । আর দুই চারশ যা আয় হয় তা দিয়েই কোনও রকম চলে তাদের সংসার। বাল্য বিয়ের মধ্য দিয়ে জীবনযুদ্ধ শুরু হলেও জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি কিংবা স্বাস্থ্য পরিচর্চা কোনওটিই তাদের বোধগম্য নয়। স্থায়ী বসবাস না করায় স্কুল বঞ্চিত এদের শিশুরা। তারা শিক্ষায় দিক্ষয় অনেক পিছিয়ে। সব মিলিয়ে যেন তাদের জীবন যুদ্ধ চলছে আগের নিয়মে। সাপ ধরা, সাপ খেলা, সিংগা লাগানো তাবিজ কবজ বিক্রি ম্যাজিক দেখানোই তাদের কর্ম। তিনি আরো জানান, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ পেশার আর কদর নেই । এ কারণে তারা অন্য পেশাতে যুক্ত হচ্ছেন । সরকারী সুযোগ সুবিধার প্রশ্নে তিনি জানান, এ সরকার অনেকটায় তাদের প্রতি নজর দিচ্ছে । সরকারী ঘর, বিভিন্ন ভাতা সহ অন্যন্য নানা সেবা। তবে বেঁদে পরিবার বলে সবার ভাগ্যে তা মিলছেনা কাঙ্খিত সব সেবা । সরদার জানান , সাত থেকে আট মাস তারা বহরে কাটায় বিধায় তারা সরকারী সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় ।
এদিকে ডিজিটাল যুগে তাদের এ পেশাকে মেনে নিতে পারছেন না সচেতন মহল । তারা বলছেন দেশ এখন উন্নয়নশীলের পথে । এ সময়ে তাদের তাবিজ কবজের মাধ্যমে আয় করা আর মানায় না। সচেতন যুগে মানুষ আর তাবিজ কবজে বা ঝাড়ফুকে বিশ্বাস করে না। এ নিয়ে তাদের পেশার কদর কমে যাওয়ায় তারা সাপ হাতে নিয়ে দলবেধে ছড়িয়ে পড়েছে শহরের পথচারীদের সামনে। তারা পথচারীদের আটকিয়ে দশ-বিশ টাকা তুলছেন সংসার চলার জন্য । এতে করে বিড়ম্বনায় পড়ছে পথচারী, অন্যদিকে উন্নয়নশীল সমাজ গঠনে বাধাগ্রস্থ করছে এসব পরিবেশ । তাই সমাজের বিশিষ্টজনেরা মনে করেন দ্রুত এদের এ পেশা থেকে বের করে উন্নয়নশীল জীবন যাপনে সহায়তা করতে সরকার ও অন্যান্য সামাজিক সংগঠনগুলো এক যোগে কাজ করবে এমনটায় আশা তাদের। আর তবেই হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরেণের স্মার্ট বাংলাদেশ।


প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২৩ | সময়: ৬:২০ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ