আজ আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ‘গ্রামীণ নারী থেকে তারা সফল উদ্যোক্তা’

স্টাফ রিপোর্টার: কেউ বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় সবজি বাগান, কেউ সংরক্ষণ করছেন বিলুপ্তপ্রায় দেশি বীজ। কেউ বরেন্দ্র অঞ্চলের উপযোগী ফসল চাষ, জৈব সার তৈরি ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে ভূমিকা রাখছেন। আবার কেউ পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি, প্রাণিসম্পদ পালন ও নারীদের সংগঠিত করার মাধ্যমে বদলে দিচ্ছেন নিজের জীবন ও আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা। একসময় যাঁরা ছিলেন সাধারণ গ্রামীণ নারী, তাঁদের অনেকেই এখন স্বাবলম্বী ও সফল উদ্যোক্তা।
এমনই ২২ জন সংগ্রামী নারীকে সম্মাননা দিয়েছে বেসরকারি সামাজিক সংগঠন বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশন। আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজশাহীতে তাঁদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেওয়া হয়। বুধবার রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের বিলনেপালপাড়ায় এ সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘গ্রামীণ নারীর উত্থান; সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ’।
সম্মাননা পাওয়া নারীদের একজন তানোর উপজেলার থানতলা এলাকার পানি মার্ডি। নিজ বাড়িতে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষের পাশাপাশি আদিবাসী নারীদের কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং নারী সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। প্রথমবারের মতো সম্মাননা পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে পানি মার্ডি বলেন, “এই প্রথম আমি কোনো সম্মাননা পেলাম। আমার আজকে খুবই আনন্দ লাগছে। আমি ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করতে চাই। আমি প্রথম থেকেই আমাদের আদিবাসীদের কল্যাণে কাজ করছি।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার শাহানা বেগমের কাজের ক্ষেত্র দেশি বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়। পাশাপাশি তিনি জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার ও প্রসারে কাজ করছেন। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে দেশি বিভিন্ন জাতের বীজ, যার অনেকগুলোই বিলুপ্তপ্রায়। এলাকার কৃষকদের মধ্যেও এসব বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। শাহানা বেগম বলেন, “বাড়িতে বসে না থেকে আমি ছোট ছোট করে কাজ করতে থাকি। আমার কাছে দেশি অনেক প্রজাতির বীজ রয়েছে এবং আমি আমার এলাকার অনেক কৃষককে সেগুলো সরবরাহ করি। আমার কাছ থেকে অনেকে বীজ নেয়। বিলুপ্তপ্রায় অনেক বীজ সংরক্ষিত রয়েছে আমার কাছে।”
পানি মার্ডি ও শাহানা বেগমের মতো নিজেদের কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার আরও ২০ নারী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মার্জিনা টুডু, জেসমিন বেগম, রুবিনা খাতুন, বিলকিস বেগম, তহমিনা বেগম, সেলিনা বেগম, সাগরী রাণী, মাইনো বাসকি, তিথি সরেন, অঞ্জলী রায়, চিচিলিয়া হাসদা, শিল্পী বেগম, আয়েশা বেগম, মিনারা বেগম, পান্না বেগম, মাহমুদা বেগম, মর্জিনা বেগম, সেতারা বেগম, সুমি বেগম ও পরি টুডু।
কৃষি ও পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এসব নারী দেশি বীজ সংরক্ষণ, বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ, প্রাণিসম্পদ পালন, কুটিরশিল্প এবং নারী সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাঁদের উদ্যোগে একদিকে যেমন পরিবারের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি ও টেকসই জীবনযাপনের চর্চা।
অনুষ্ঠানে গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহী জেলার সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, “যারা সমাজের উন্নয়ন এবং সমাজকে নিয়ে ভাবেন, আজকে আমরা তাঁদেরই সম্মাননা দিয়েছি। এখন বর্তমানে গ্রামীণ নারী বলতে শুধুমাত্র অবহেলিত নয়, আমাদের এই অনুষ্ঠানে আপনারা দেখলেন, গ্রামীণ নারী থেকেই আজ তাঁরা স্বাবলম্বী। তাঁদের এই উন্নয়নযাত্রায় পাশে থাকতে পেরে আমাদেরও ভালো লাগছে। আমাদের এই ধরনের কার্যক্রম চলমান থাকবে।”
বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম বলেন, “রাজশাহীর বিভিন্ন জেলা থেকে আগত গ্রামীণ নারী থেকে স্বাবলম্বী হওয়া নারীদের আজকে আমরা সম্মাননা দিয়েছি। আমাদের সমাজে শুধুমাত্র পুরুষই নয়, নারীরাও এগিয়ে গেছেন। নারীরা এখন নিজেরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন এবং আশপাশের অন্যদেরও স্বাবলম্বী করছেন।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গ্রিন কোয়ালিশন পবা উপজেলা সভাপতি রহিমা খাতুন, সমাজকর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু এবং পবা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক। সম্মাননা অনুষ্ঠানকে ঘিরে ছিল অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য, নারীদের উদ্ভাবিত লাগসই কৃষিপ্রযুক্তি, বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব চুলা ও জৈব কৃষি উপকরণের প্রদর্শনী। পাশাপাশি বস্ত্র ও খাদ্যপণ্যের প্রদর্শনীর মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও স্থানীয় সম্পদনির্ভর উদ্যোগ তুলে ধরা হয়।


প্রকাশিত: October 15, 2026 | সময়: 4:57 am | সুমন শেখ