, , ।
স্পোর্টস ডেস্ক: জাপানের আইচি-নাগোয়ায় জমকালো সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল ২০তম এশিয়ান গেমসের। ৪ অক্টোবর নাগোয়ার নাগোয়া সিটি মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে ১৬ দিনের ক্রীড়াযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সে সঙ্গে ২০৩০ সালের পরবর্তী এশিয়ান গেমসের আয়োজক দোহা, কাতারের কাছে এশিয়ান গেমসের পতাকা হস্তান্তর করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানের মূল বার্তা ছিল ‘ওয়ান এশিয়া’। এশিয়ার দেশগুলোর ঐক্য, পারস্পরিক বন্ধন এবং খেলাধুলার মাধ্যমে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার বার্তাই ছিল আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু। অনুষ্ঠানে আলো-লেজার, নৃত্য, পার্কুর পরিবেশনা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে জাপান তাদের আতিথেয়তার শেষ অধ্যায় সাজায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাপানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর ছিল অ্যাথলেটদের সম্মানে বিভিন্ন পরিবেশনা। পার্কুর শিল্পীদের একটি পরিবেশনায় জাপানের চেরি ফুলের অনুপ্রেরণাও তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন দেশের অ্যাথলেটরা একে অন্যের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং এশীয় ক্রীড়ার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সম্মিলিতভাবে অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়া (ওসিএ)-এর পতাকা নামিয়ে পরবর্তী আয়োজক শহর দোহার কাছে হস্তান্তর। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০৩০ সালের এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতির পথ খুলে গেল কাতারের জন্য। ওসিএ সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানি অনুষ্ঠানে ২০২৬ সালের আসরকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করেন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানিও সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ২০৩০ সালে দোহায় হবে এশিয়ান গেমসের ২১তম আসর। পতাকা হস্তান্তরের মাধ্যমে যেন জাপান থেকে কাতারের হাতে চলে গেল এশিয়ার বৃহত্তম বহুক্রীড়া আসরের দায়িত্ব। ‘ওয়ান এশিয়া’ বার্তার ধারাবাহিকতাই সামনে নিয়ে চার বছর পর দোহায় আবারও একত্রিত হবে এশিয়ার ক্রীড়াবিদরা।
আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস শেষ হয়েছে রেকর্ডের ছড়াছড়ি দিয়ে। আসরে ৫০টির বেশি বিশ্ব রেকর্ড হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ওসিএ’র হিসাবে এ আসরে ৫৪টি বিশ্ব রেকর্ড ও ৮৯টি এশীয় রেকর্ড হয়েছে।
বিশেষ করে তরুণ অ্যাথলেটরা পুরো আসরের আলো কেড়ে নিয়েছেন। চীনের মাত্র ১৩ বছর বয়সী সাঁতারু ইউ জিদি তিনটি সোনার পদক জিতে সবচেয়ে নারী উদীয়মান নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০ মিটার বাটারফ্লাই, ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলে এবং ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে সোনা জয়ের পথে তিনি তিনটি গেমস রেকর্ড করেন এবং ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে একটি এশীয় রেকর্ডও গড়েন।
ইউ জিদির পাশাপাশি থাইল্যান্ডের ২০ বছর বয়সী স্প্রিন্টার পুরিপল বুনসনও ছিলেন আসরের অন্যতম বড় তারকা। পুরুষদের ১০০ ও ২০০ মিটারে সোনা জয়ের পাশাপাশি তিনি দুই ইভেন্টেই এশিয়ান গেমসের রেকর্ড গড়েছেন। ২০০ মিটারে তার ১৯.৮৮ সেকেন্ডের সময় এশিয়ান রেকর্ডেরও সমান। পরে তাকে পুরুষ সবচেয়ে উদীয়মান নির্বাচিত করা হয়। ওসিএ দুই এমভিপিকে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার করে পুরস্কারও দিয়েছে।
পদক তালিকায় চীনের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। চীন ১৬৯টি সোনাসহ মোট ৩৪১টি পদক নিয়ে শীর্ষে থেকে আসর শেষ করেছে। দ্বিতীয় স্থানে ছিল স্বাগতিক জাপান। চীনের এই সাফল্য ছিল এশিয়ান গেমসে টানা ১২তমবার পদক তালিকার শীর্ষে থাকার ঘটনা। চীনের এই সাফল্যের পেছনে সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, জিমন্যাস্টিকস, শুটিং, মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন খেলায় তাদের বিস্তৃত শক্তিমত্তা বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে তরুণ অ্যাথলেটদের সাফল্য আগামী আন্তর্জাতিক আসরগুলোর জন্যও দেশটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। এবারের এশিয়ান গেমসে ২১টি সোনাসহ মোট ৮৫টি পদক জয় করে ভারত।
সাফল্যের পাশাপাশি আইচি-নাগোয়া গেমসকে ঘিরে সংগঠন নিয়েও নানা আলোচনা হয়েছে। প্রায় ১৭ হাজার অ্যাথলেট ও কর্মকর্তা অংশ নেওয়া এই আসরে ৪৬৯টি সোনা জয়ের ইভেন্ট ছিল। এত বড় পরিসরের আয়োজনের কারণে আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। কোনো কোনো দলকে হোটেল, কনটেইনার ইউনিট এমনকি একটি ক্রুজ জাহাজেও রাখা হয়েছিল।
কিছু ঘটনায় জাতীয় সংগীত ও পতাকা ব্যবস্থাপনাতেও ভুল দেখা গেছে। দর্শক উপস্থিতি নিয়েও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ওসিএ শেষ পর্যন্ত আসরটিকে সফল হিসেবে মূল্যায়ন করেছে এবং বিপুলসংখ্যক বিশ্ব ও মহাদেশীয় রেকর্ডকে এর অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে।
আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল নতুন কিছু খেলার অন্তর্ভুক্তি। প্যাডেল ও সার্ফিং প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নেয়। এতে বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে এশিয়ান গেমসও নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করছে। প্রচলিত অলিম্পিক ও এশিয়ান গেমসের খেলাগুলোর পাশাপাশি নতুন ও জনপ্রিয় ক্রীড়া যুক্ত করার প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে।
সমাপনী অনুষ্ঠানের শেষদিকে ধীরে ধীরে নিভে যায় এশিয়ান গেমসের শিখা। ১৬ দিনের প্রতিযোগিতা শেষ হলেও অ্যাথলেটদের অর্জন, রেকর্ড এবং নানা স্মৃতি থেকে যাবে এ আসরের ইতিহাসে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় দোহাকে। অর্থাৎ শেষ হলো আইচি-নাগোয়া ২০২৬, শুরু হলো দোহা ২০৩০-এর কাউন্টডাউন।