সর্বশেষ সংবাদ :

মহাসড়কে আতঙ্কের নাম বালুবাহী ডাম্প ট্রাক

সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে বেপরোয়া গতিতে চলাচলকারী বালু ও মাটিবোঝাই ট্রাক বা ডাম্প ট্রাক বর্তমানে নিরাপত্তার জন্য একটি মারাত্মক হুমকি ও আতঙ্কের নাম। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অদক্ষ চালকরা এসব ভারী যানবাহন চালালেও কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি নেই। এছাড়াও পদ্মা নদী থেকে বৈধ আর অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু।
নদী থেকে বালু উত্তোলনেও মানা হচ্ছে না কোন নীতিমালা। যার ফলে নদীর তীর রক্ষা বাঁধ রয়েছে হুমকীর মুখে। সেই বালুগুলো জেলার ভেতরসহ আশেপাশে জেলাগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ডাম্প ট্রাক ছাড়াও ট্রাক, ট্রাক্টর ওভার লোড, বেপরোয়া গতি ও খোলা অবস্থায় বালু নিয়ে যাওয়ায় প্রায়ই ঘটছে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, প্রতিবছর বহু মানুষের ঝরছে প্রাণ। এলাকাবাসী ট্রাকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিলেও রহস্য জনক কারণে নীরব থাকছে প্রশাসন। সড়ক বিভাগ বলছে, এক্সেল লোড মেশিন স্থাপনের কাজ শেষ হলেই নিয়ন্ত্রণে আসবে ট্রাকগুলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোদাগাড়ীর পদ্মার বালুঘাটগুলো থেকে দিনরাত বালু ও নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে বিক্রি করছে বালু মাফিয়ারা। একেকটি ট্রাকে ৩০ থেকে ৪০ টন করে বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে। অথচ এসব সড়কের সর্বোচ্চ ভারবহন ক্ষমতা ১৫ থেকে ২০ টন।
অন্যদিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর প্রেমতলী ও ফুলতলা বালুঘাট থেকে তোলা রাত দিন বেপরোয়া গতিতে দাপিয়ে ক্ষমতার অতিরিক্ত বালু বোঝাই শত শত ডাম্প ট্রাকে বালু ও মাটি বহনের ফলে রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়ক ও বিজয়নগর-উজানপাড়া ভিতরপাশ পিচঢালা সড়ক ও গ্রামীণ রাস্তাগুলো অল্প সময়েই ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
এসব সড়ক পথে বালুবাহী ভারি ডাম্প ট্রাক চলাচলের কারণে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়কগুলো ভেঙে যাচ্ছে। এলাকাবাসী কয়েকবার বিক্ষোভ করলেও বালু মাফিয়াদের প্রভাবের কারণে প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরেজমিনে দেখা যায়, গোদাগাড়ী উপজেলার সেখেড়পাড়া, ভাটোপাড়া ফুলতলা, সারেংপুর, সুলতানগঞ্জ গাঙ্গবাড়ী সহ বিভিন্ন পয়েন্টে পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন করে নেওয়া হচ্ছে ডাম্প ট্রাক, ট্রাক, ট্রাক্টরে করে। বেপরোয়া গতি ও বালু নামমাত্র পর্দা দিয়ে ঢেকে নিয়ে যাওয়ায় ডাম্প ট্রাক থেকে বালু উড়ে এসে পথচারী, স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, মোটরসাইকেল চালক ও সব ধরনের যানবাহনের চালকদের চোখে মুখে পড়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ।
সড়কের পাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট বাজার থাকায় ট্রাকের কারণে সড়কে চলাচলকারীরাও থাকেন চরম আতঙ্কে। হর্ণ, ধুলা বালি আর কালো ধোঁয়ায় নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সড়ক। শুধু তাই নয়, বালু ও ধুলোর কারনে শ্বাস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে।
সেখেড়পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে শত শত ডাম্প ট্রাক চলাচল করে। কোন নিয়ম মানে না এরা। বেপরোয়া গতিতে চালায় গাড়ী। এতে অনেকেই দুর্ঘটনায় পড়ছেন প্রতিনিয়ত। নাচোলগামী মোটরসাইকেল আরোহী শরীফ বলেন, চোখ-মুখ ধুলায় ভরে যায়, কিন্তু কিছু করার থাকে না। এক দিকে বাতাস আর বেপরোয়া গতির গাড়িতে দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রশাসনের পদক্ষেপ কামনা করছি।
অটোচালক দুলাল বলেন, এ সড়কে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কিছুদিন ধরে সড়কে বালুবাহী গাড়ির বেপরোয়া গতি আর বালু উড়ে চোখে-মুখে পড়ছে। এতে যাত্রী ও আমাদের অনেক সমস্যা হয়।
ভাটোপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তোফাজ্জল জানান, ডাম্প ট্রাকগুলো থেকে অনবরত ধুলাবালি উড়ে চারপাশের বাতাস ও পরিবেশ দূষিত করছে, যা পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে। বালু উড়ে ঘরে ঢুকে। জানলা দরজা সব সময় বন্ধ রাখতে হয়। বাইরে ভেজা কাপড় শুকানো যায় না বালুর কারনে। আমরা অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি না। কখন দুর্ঘটনা ঘটে সেই আতঙ্কে থাকি। এ ব্যাপারে গোদাগাড়ী উপজেলা নাগরিক স্বার্থ রক্ষা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, বেপরোয়া ডাম্প ট্রাকগুলো এভাবে বালু বহন করা হলে মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। এগুলো প্রশাসনের নজরদারি থাকা উচিত। তবে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।
রাজশাহী বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, বালুর ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলের কারণে রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়েকে বছরে শতাধিক মানুষের প্রাণ ঝরছে। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল। যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের। বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে বলে বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বলেন, সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি বালুবাহী ট্রাকের কারণে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান। তিনি আরও বলেন, বালু ও মাটিবাহী ট্রাকসহ অপ্রচলিত বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে জেলার সড়কগুলো দিয়ে। রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়ক ঘেঁষে তৈরি হয়েছে অনেক ইটভাটা। এসব ইটভাটায় বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে যথেষ্টভাবে। বালু ও মাটি বহনের সময় ঢেকে রাখা হয় না। ট্রাক থেকে বালু ও কাদামাটি সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে যায়। এতে সড়কে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে তেমনি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়কগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী ট্রাফিক সার্জেন্ট আমির হামজা বলেন, ইদানিং ডাম্প ট্রাকের দৌরাত্ম্য কিছুটা বেড়েছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করি। এছাড়াও ডাম্প ট্রাকের চালক এবং মালিকদের ট্রাফিক আইন ও গতিসীমা কঠোরভাবে মেনে চলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। এছাড়া খোলা অবস্থায় বালু পরিবহন করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। এর ব্যতিক্রম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


প্রকাশিত: October 6, 2026 | সময়: 4:45 am | সুমন শেখ

আরও খবর