, , ।
মওদুদ আহম্মেদ, আক্কেলপুর: জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষের গ্রিল কেটে ট্রান্সফরমারের মোটা তার চুরি করেছে দুর্বৃত্তরা। এর পর কম ভোল্টেজের কারণে একের পর এক বৈদ্যুতিক যন্ত্র পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে থাকা উচ্চ ভোল্টেজের ট্রান্সফরমার ও নিয়ন্ত্রণ ইউনিটও পুড়ে যায়। এতে পুরো প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। চুরির ঘটনায় সৃষ্ট বৈদ্যুতিক গোলযোগে প্রায় ১৬ লাক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। এতে সামনে পরীক্ষা ও ভাইভা থাকলেও অনির্দিষ্টকালের জন্য একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ২৮৮ শিক্ষার্থী। বিশেষ করে দূরের জেলার শিক্ষার্থীরা ভাইভা পরীক্ষা থাকায় বাড়ি ফিরে যাওয়া নিয়ে পড়েছেন বিড়ম্বনায়।
সরেজমিনে আইএইচটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের কক্ষে অধ্যক্ষ সহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবস্থান করছেন। পুরো ক্যাম্পাসে নেই শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক আনাগোনা। মহিলা হোস্টেলে ঝুলছে তালা। অল্প কয়েকজন ছাত্র হোস্টেলে থাকলেও তারাও বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে আছে।
আইএইচটি সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতের কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষের গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে মূল ট্রান্সফরমারের ১৫০ বর্গমিলিমিটারের মোটা কয়েকটি তার কেটে নিয়ে যায়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হলেও সরবরাহে মারাত্মক ভোল্টেজ ঘাটতি দেখা দেয়।
কম ভোল্টেজের কারণে আবাসিক হোস্টেলের ফ্যান, লাইটসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পুড়ে যায়। প্রশাসনিক ভবনে ভাইস প্রিন্সিপালের কক্ষের এসি ও লাইটও পুড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষে শর্টসার্কিটের ঘটনা ঘটে। এতে সেখানে থাকা উচ্চ ভোল্টেজের ট্রান্সফরমার ও নিয়ন্ত্রণ ইউনিট পুরোপুরি পুড়ে যায়। এরপরই পুরো প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২ সালে গোপীনাথপুর আইএইচটির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ল্যাবরেটরি ও ফার্মেসি দুটি টেকনোলজিতে ২৮৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাদের সবাই আবাসিক হোস্টেলে থাকেন। শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেল রয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। দিনের বেলায় গরম আর রাতে অন্ধকারের মধ্যে তাদের থাকতে হচ্ছে। পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশও নেই। এর মধ্যে সামনে পরীক্ষা ও ভাইভা থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে আরও জানা গেছে, বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ক্যাম্পাসে সোলার সিস্টেম থাকলেও সেটি চালুর পর থেকেই অচল। ফলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। রাতের বেলায় আবাসিক শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়। এ অবস্থায় অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মিলন সরকার বলেন, ‘গত ৭ সেপ্টেম্বর বৈদ্যুতিক তার চুরির পর থেকেই আমাদের আইএইচটির বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। এ কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিষ্ঠান ছুটি দেওয়া হয়েছে। সামনে আমাদের পরীক্ষা ও ভাইভা। এই সময়ে এসে এমন পরিস্থিতিতে আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। হোস্টেলে বিদ্যুৎ নেই, পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করে আমাদের পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাই।’
মাজহারুল ইসলাম নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। বিদ্যুৎ না থাকায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে হোস্টেল ছাড়তে বলা হয়েছে। আমার বাড়ি অনেক দূরে। যেতে প্রায় দুই দিন লেগে যায়। সামনে পরীক্ষা থাকায় বাড়িও যেতে পারছি না। আবার অন্ধকারের মধ্যে হোস্টেলেও থাকা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সহপাঠী বাড়ি চলে গেলেও দূরের শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছেন। আমরা দ্রুত সমস্যার সমাধান চাই।’
জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আবদুর রহমান সরকার বলেন, ‘ঘটনার পর খবর পেয়ে আমরা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছি। ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ট্রান্সফরমারটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব। তারা নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন করলেই বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা সম্ভব হবে। তবে মিটার পর্যন্ত আমাদের সংযোগ চালু রয়েছে।’
গোপীনাথপুর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল কুদ্দুস মন্ডল বলেন, ‘তার চুরির পর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় একের পর এক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কম ভোল্টেজের কারণে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ পুড়ে যায়। পরে শর্টসার্কিটে ট্রান্সফরমার ও নিয়ন্ত্রণ ইউনিটও পুড়ে যাওয়ায় পুরো প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় আমরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি। বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ব্যয় নির্ধারণ করে গেছেন। আশা করছি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’
আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান মাসুদ বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।