পুঠিয়ায় দুই সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ : পুঠিয়ায় পৌরসভা ভবনের ৫৮ লাখ টাকার গরমিল

স্টাফ রিপোটার, পুঠিয়া: নাগরিক সেবার আধুনিক ঠিকানা গড়ে তুলতে যে অর্থ এসেছিল সরকারি কোষাগার থেকে, সেই অর্থের বড় অংশই এখন অনিয়মের অভিযোগে ঘেরা। রাজশাহীর পুঠিয়া পৌরসভার ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ হওয়া সরকারি অর্থের ৫৮ লক্ষ টাকা পৌর তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পৌরসভার দুই সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছে বর্তমান পৌর প্রশাসন। ইতোমধ্যেই অভিযোগের নথি হাতে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে দুদক।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, পুঠিয়া পৌর ভবন নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে মোট ৭৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থটি জনতা ব্যাংক, পুঠিয়া শাখায় ‘পৌর ভবন তহবিল, পুঠিয়া পৌরসভা’ নামে খোলা একটি বিশেষ ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষিত ছিল। অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে ওই হিসাব থেকে সাবেক মেয়র রবিউল ইসলাম ও সাবেক মেয়র আল মামুন খান অর্থ উত্তোলন করেন। পরবর্তীতে কিছু অর্থ ফেরত দিলেও প্রত্যেকে ২৯ লক্ষ টাকা করে মোট ৫৮ লক্ষ টাকা আর পৌর তহবিলে জমা পড়েনি।
পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাস সুমিত জানান, পৌর ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অডিট প্রতিবেদন ও ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের পর তার একটি অংশ সরকারি তহবিলে আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এটি সরকারি অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। বিষয়টি নজরে আসার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, অডিট-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও অন্যান্য নথি সংযুক্ত করে দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। এখন তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দুদকের।
‘পৌরসভা সূত্রের দাবি, বর্তমানে ওই বিশেষ ব্যাংক হিসাবে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ১৬ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৯ টাকা ৫৪ পয়সা। বাকি অর্থের হিসাব এবং তা সরকারি তহবিলে ফেরত না আসার বিষয়টিকেই অভিযোগের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগপত্র, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তাঁদের হাতে পৌঁছেছে। তাঁর কথায়, ‘অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে দুদকের বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান টিম গঠন করা হবে।
অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ সহ আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য সাবেক মেয়র এবং উপজেলা ও পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আল মামুন খান মুঠোফোনে বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’ পরে তিনি এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
অন্যদিকে, সাবেক মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করে বলেন, আমি দায়িত্ব ছেড়ে আসার সময় সব হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে দিয়ে আসছি। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ নিয়ে এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই পুঠিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, অভিযোগটি যেহেতু সরকারি অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে জনগণের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিও তুলেছেন তাঁরা। এখন নজর দুদকের দিকে। অভিযোগ কি কেবল নথির পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অনুসন্ধানে উঠে আসবে সরকারি অর্থ ব্যবহারের নেপথ্যের প্রকৃত চিত্র, সেই উত্তরই খুঁজছে পুঠিয়ার মানুষ।


প্রকাশিত: July 10, 2026 | সময়: 4:05 am | সুমন শেখ