সর্বশেষ সংবাদ :

বেকারত্বের অন্ধকারে আশার আলো ‘ফ্রিল্যান্সিং’

সবুজ ইসলাম: ২ হাজার ৪০৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজশাহী জেলায় দিন দিন বাড়ছে বেকারত্ব। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও বহু তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে বেকার মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখেরও বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই বছরে এ সংখ্যা আরও বেড়েছে।
তবে এই বেকারত্বের অন্ধকারের মাঝেই নীরবে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে ফ্রিল্যান্সিং। একটি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ, এমনকি একটি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই ঘরে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন রাজশাহীর অসংখ্য তরুণ। ফলে চাকরির পেছনে না ছুটেও নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করছেন তারা।
রাজশাহী মহানগরের পাশাপাশি পুঠিয়া, গোদাগাড়ী, চারঘাট, বাঘা, মোহনপুর, তানোর, দুর্গাপুর, বাগমারা ও পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই পেশা। কেউ কাজ করছেন গ্রাফিক্স ডিজাইন, কেউ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং, কনটেন্ট রাইটিং, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট কিংবা ডাটা এন্ট্রির মতো খাতে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার যুবক সৈয়ব আলী শেখ। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানোর উদ্দেশ্যে বন্ধুদের কাছ থেকে শিখেছিলেন ফ্রিল্যান্সিং। ২০২৪ সালে চার বন্ধু মিলে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ শুরু করেন। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সেই ছোট উদ্যোগ এখন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে তার তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন ৩২ জন তরুণ। সৈয়ব আলী শেখ বলেন, “রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের সংকট অনেক আগে থেকেই। এখানে অনেকেই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেও চাকরি পান না। তাই চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই ফ্রিল্যান্সিং শুরু করি। এখন আমাদের মাসিক আয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে।”
তার প্রতিষ্ঠান ই কর্মাস সিল্ডের মোসাদ্দেক আলী রনি বলেন, “আগে বেকার ছিলাম। বন্ধুদের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে পারি। প্রায় ছয় মাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখন ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কাজ করছি। শুরুতে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হতো। এখন ২০ হাজার টাকার বেশি আয় হচ্ছে।”
আরেক প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন পি-ফাই কাজ করছে অর্ধশতাধিক বেকার যুবক। দেশে বসেই উন্নত বিভিন্ন রাষ্ট্রে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করছে তারা। এতে যেমন অনেক যুবকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক তেমনি ভাবে দেশের অর্থনীতি সঞ্চার হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক আকতারুল ইসলাম বলেন,“সংসারের বোঝা না হয়ে, আমি এখানে কাজ করে আমার সংসার চালাচ্ছি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও আমার এখানে কাজ করতে কোন সমস্যা হয় না। আমি এখানে কাজ করে মাস শেষে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করছি।”
রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকার বাসিন্দা মো. রাকিব হাসান বলেন, “স্নাতক শেষ করার পর প্রায় দুই বছর চাকরির চেষ্টা করেছি। কোথাও সুযোগ পাইনি। পরে ইউটিউব দেখে গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখি। শুরুতে অনেক কষ্ট হলেও এখন বিভিন্ন বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছি। মাসে গড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। পরিবারের খরচেও সহযোগিতা করতে পারছি।”
রাজশাহী কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুন বলেন, “নারীদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং বড় সুযোগ। সব সময় বাইরে গিয়ে চাকরি করা সম্ভব হয় না। বাসায় বসেই কাজ করছি। নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারছি, পরিবারেও অবদান রাখতে পারছি। আমরা প্রথমে ৩ মাস এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই। পরবর্তীতে নিজেরাই প্রতিষ্ঠান খুলে কাজ করতে পারছি।”
এদিকে জেলার বিভিন্ন প্রত্যান্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে ফিল্যান্সিং। কেউ অফিস কিংবা ঘর ভাড়া নিয়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের টিম তৈরী করে শুরু করেছে ফিল্যান্সিং। এতে প্রত্যান্ত অঞ্চলের যুবকেরা স্বাবলম্বী হচ্ছে।
রাজশাহীর বিভিন্ন আইটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ফ্রিল্যান্সিং শেখার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ফøীট নামের একটি আইটি সেন্টারের প্রশিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আগে একটি ব্যাচে ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকত। এখন ৫০ থেকে ৬০ জন ভর্তি হচ্ছেন। অনেকেই সফলভাবে আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন। তবে শুধু কোর্স করলেই হবে না, ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন ও দক্ষতা অর্জনই সফলতার মূল চাবিকাঠি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রিল্যান্সিংয়ের সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, তেমনি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার অভাব, আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগে দুর্বলতা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের সংকট এবং প্রতারণামূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কারণে অনেক নতুন ফ্রিল্যান্সার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে ফ্রিল্যান্সিং বেকারত্ব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্মত প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। নিরবিছিন্ন বিদ্যুত সংযোগ এবং উচ্চ গতির ইন্টারনেট ছড়িয়ে দিতে হবে পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে কেউ যাতে প্রতারিত না হয়।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্রিল্যান্সিং শুধু ব্যক্তিগত আয়ের পথ নয়; এটি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্লায়েন্টের কাজ করে তরুণরা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন। এতে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রাখছে এই খাত।


প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬ | সময়: ৪:১৭ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর