রবিবার, ৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সানশাইন ডেস্ক: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে শিগগিরই বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
জুলাই জাতীয় সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, আপনারা দাবি করেছেন; তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দল হিসেবে—সেই রাজনৈতিক দলকে বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।
“সংবিধানের ৪৭ আর্টিকেল অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে, রাজনৈতিক দলের সংগঠনের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।” জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে যারা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি ভবিষ্যতে জাতি দেখবে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আজকে যারা এই অনুষ্ঠানের আয়োজক, তাদের প্রতি আমার অনুরোধ রইল এই জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে যেন আমরা কেউ ব্যবসা না করি।
“যারা জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংগঠন করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি কিন্তু ভবিষ্যতে দেখা যাবে; ইতিহাস কিন্তু তাই।” আওয়ামী লীগের ‘পরিণতির’ প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন বলেন, “যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করত, তারা চেতনা বিক্রি করতে করতে আজকে দিল্লি গিয়ে বসে আছে।
“বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে উৎখাত করেছে। সুতরাং চেতনা বিক্রির ব্যবসা ভালো নয়, রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভালো না।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা মহান চব্বিশের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে ধারণ করব, স্মৃতিকে ধারণ করব। “অনাগতকালে ভবিষ্যতে আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যেন দেখে—স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদের পতন কীভাবে হয়েছিল? ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী আচরণ যেন ভবিষ্যতের কোনো সরকার না করে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ওয়াসিম আকরামের কথা বলতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “শহীদ হওয়ার মাত্র দুইদিন আগে আমাকে শিলংয়ে দেখতে গিয়েছিল ছেলেটা। কেন বাবা এতো অল্প বয়সে বাবা-মার টাকা খরচ করে পাসপোর্ট-ভিসা করে আমাকে দেখতে এলে? বলেছিল, ‘আপনাকে একনজর সামনে থেকে দেখব- বড় আশা ছিল’। ছবি তুলেছিল, ফেসবুকের প্রোফাইলে ছবিটা সে দিয়েছিল। দুই-তিন সপ্তাহ পরে দেশে এসে বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়ে দিল।
“বড় করুণ সেই ইতিহাস। তার বাবা তখন বিদেশে। তার মায়ের সাথে কথা বললাম, চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। সে আজকে বলল, যে শহীদের বিচার করুন আগে। আমরা দেখতে চাই, এই দেশে প্রত্যেকটা খুনের বিচার হয়েছে।” ঢাকার আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে জুলাই ’২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি এবং আমরা জুলাই যোদ্ধা। অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “পাঁচটা গণহত্যার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় হয়েছে ইতোমধ্যে। বিচারাধীন মামলা আছে ২৭টা এবং তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে ৭২টা মামলা। শহীদ আবু সাঈদের মামলায় প্রথম মামলায় দুজনের ফাঁসি হয়েছেৃভাইস চ্যান্সেলরসহ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে।
“প্রথম মামলার রায় হয়েছে, গণহত্যার। আপনারা সবাই জানেন—শেখ হাসিনা, তার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল তাদের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তৎকালীন আইজিপি মামুন রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে তার সাজা কম হয়েছে, তবে সাজা হয়েছে।
“আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো হত্যা মামলার দুইজনের ফাঁসি হয়েছে; ওখানে সাবেক একজন স্বৈরাচার দোসর এমপি আছে, ওসি আছে, ডিআইজিসহ অন্যান্যদের যাবজ্জীনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘চাঁনখারপুলে হত্যা মামলায় ফাঁসি হয়েছে তৎকালীন স্বৈরাচারের দোসর পুলিশ কমিশনার হাবিব এবং জয়েন্ট কমিশনার সুদীপ্তৃতাদের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। অতি সম্প্রতি রায় হয়েছে। রামপুরা টিভি সেন্টারের ওখানে একটা ছেলে লুকিয়েছিল, তাকে গুলি করা হয়েছিল।
“আমি শুনলাম সেই ছেলেটি কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছে। চিকিৎসার মাধ্যমে আল্লাহ তার জীবন বাড়িয়ে দিক, হায়াত বাড়িয়ে দিক। সেই ঘটনায় আরো দুই-একজনকে শিশুসহ হত্যা করা হয়েছে ৃসেই মামলায় রায় হয়েছে। ফাঁসির আদেশ হয়েছে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিব, ওসি এবং অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে।”
তিনি বলেন, “সর্বশেষ হাসানুল হক ইনু নামের একজন স্বৈরাচারের দোসর আছে, তার বিচারের রায় বেরিয়েছে। তাকে কেবল ১০ বছরের সাজা দেয়াতে বাদী পক্ষ সন্তুষ্ট নয়, সেজন্য সেটা আপিল করা হবে মর্মে শুনেছি। “তার অন্তত যাতে সর্বোচ্চ সাজা হয়, সেরকম বিচার আরো আছে; সে মামলাগুলোতে আশা করা যায়।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘কিছু পর্দার আড়ালের কথা আজকে অবমুক্ত করতে চাই। আমি ও আমার নেতা জনাব তারেক রহমান দুজনেই আমরা নির্বাসিত ছিলাম। আল্লাহর কি মহিমা যদি আমরা নির্বাসিত না থাকতাম, হয়তো এই জুলাইয়ের মত একটা উত্থান সফলভাবে সমাপ্ত করা সম্ভব হতো না। এটাই হচ্ছে পর্দার অন্তরালের কথা।
“কোনোদিন আমরা ঘুমাইনি। ২৪টা ঘণ্টা কো-অর্ডিনেশন করে আমাদের নেতাকর্মীদেরকে বিভিন্নভাবে আমরা অর্গানাইজ করে এই জুলাই যোদ্ধাদের সম্মুখে রেখে অরাজনৈতিক পরিচয়ে এই আন্দোলনকে একটা পর্যায় পর্যন্ত আমরা নিয়ে এসছি। তিন তারিখ, চার তারিখে আমরা যখন নৈতিক সমর্থন প্রদান করি।” তিনি বলেন, “যেদিন আমরা ১৬ জুলাই পর্যন্ত পৌঁছালাম, সেদিন আমার নেতা তারেক রহমান বলেছেন, ‘দফা এক দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ’। অন্য কোনভাবে সমস্যার সমাধান হবে না। “আজকে যারা জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দাবি করেন, তাদের অনেকেই সেদিন বলেছিল, ‘আমাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নাই, আমাদের দাবি বৈষম্যহীন’ৃকোটা বৈষম্য দূর করতে হবে, সেটাই ছিল তাদের বক্তব্য। আমরা জানি, স্বৈরাচারকে গতিতে রেখে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাদেরকে আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, কিন্তু তাদের সেই সাহস ছিল না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা অরাজনৈতিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শত সহস্র শহীদের রক্তের এই স্রোতের মধ্য দিয়ে আমরা এই জায়গায় এসে আছি আজকে। এই বাংলাদেশ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, এই মানচিত্র রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, শহীদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি ৫ অগাস্ট। “সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ে যদি বিভাজন করি, তাহলে সর্ববৃহৎ অংশটি থাকবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের, যুবদলের, বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের।”সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “জাতিসংঘের যে রিপোর্ট, সেই রিপোর্টে ১৪০০ কথা বলা আছে কিন্তু অফিশিয়ালি বিভিন্ন পত্রিকায় এবং জরিপে ৭০০ থেকে ৮০০-র মত খতিয়ান পাওয়া যায়। বাকিগুলো গেল কোথায়? কারণ শহীদের খতিয়ান হসপিটাল রক্ষা করতে পারে নাই, তাদের ডকুমেন্ট পর্যন্ত গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে দাফন করা হয়েছে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। আজকে স্বজনরা তার কবরের সন্ধান করে, আমরা দিতে পারি না।
“এরকম একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে, গণহত্যার পরে আজও পর্যন্ত সেই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো রকমের অনুশোচনা নাই। তারা জুলাই যোদ্ধাদেরকে অপরাধী হিসেবে তকমা দিচ্ছে, বাংলাদেশের এই গণ-অভ্যুত্থানকে তারা একটা জঙ্গি তকমা দিচ্ছে। বাংলাদেশে নাকি জঙ্গিবাদের মধ্য দিয়ে তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে! এর চাইতে লজ্জাকর আর কিছু নেই।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আওয়ামী লীগের মধ্যে অনুশোচনাও নেই, দোষ স্বীকারের সেই অবস্থাও তাদের নেই, সেই ইতিহাসও তাদের নেই। তারা উল্টো বিদেশে বসে বাংলাদেশে এখন নাকি গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের ষড়যন্ত্র করছে। “আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে। দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না।”