বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
অহিদুল হক, বড়াইগ্রাম: বড়াইগ্রামের ইউএনওর কাঁধে রয়েছে উপজেলা ও পৌরসভাসহ ১৬৮ পদের ভার। উপজেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৪৪টি। দাখিল ও আলিম পর্যায়ের ১৯টি মাদ্রাসা রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ আছে ১৩ টি। তার মধ্যে ৪টি কলেজ, দুটি মাদরাসা ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় বাদে অবশিষ্ট ৬৯টি প্রতিষ্ঠানের তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতার কাগজে স্বাক্ষর করতে হয় ইউএনওকে। দেখতে হয় তাদের ফাইলপত্রও। কোনো প্রতিষ্ঠানের মামলা থাকলে সেখানে বাড়তি সময় ব্যয় হয়। এছাড়া উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি হিসেবে তাকে চারজনের অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান, দুইজন ভাইস চেয়ারম্যান ও বড়াইগ্রাম পৌরসভার মেয়র না থাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থানীয় সভাপতি না থাকায় এভাবে অন্তত ১৬৮ টি পদের দায়িত্ব সামলাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের স্থায়ী কমিটির ৯টিতে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আর আটটিতে পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কয়েকটি কমিটিতে উপদেষ্টা এবং ৮-১০টি কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকেন। তবে তারা না থাকায় উপজেলা প্রশাসক হিসাবে সব কমিটির দায়িত্ব এখন ইউএনওর কাঁধে। একই ভাবে পৌর মেয়র-কাউন্সিলরদের অপসারণ করায় ইউএনও বড়াইগ্রাম পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠানসহ নানা জনের লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ শোনা এবং সেগুলোর সমাধানও অনেক ক্ষেত্রে তাকেই করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা কমিটি থেকে শুরু করে শিক্ষা, কৃষি উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী ভাতা, হাটবাজার ব্যবস্থাপনা, বয়স্ক-বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত ভাতা, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি, মাতৃত্ব ভাতা, চোরাচালান প্রতিরোধ, এনজিও সমন্বয়, টেন্ডার, টিআর-কাবিটা, বিভিন্ন দিবস উদযাপনসহ উপজেলা পর্যায়ে সরকারি দপ্তরগুলোর বিভিন্ন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ইউএনও। উপজেলা পর্যায়ে একজন ইউএনও স্বাভাবিকভাবে ৪০ থেকে ৪৫টি কমিটির সভাপতি থাকেন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও তার কাঁধে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ দখলের প্রতিযোগিতা চলে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর মধ্যে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মাত্র ৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। অবশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদাধিকার বলে সভাপতি পদের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। ইউএনও’র কার্যালয়ের সহ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, তারা বাড়তি কাজের চাপে আছেন।
প্রায় দিনই সন্ধ্যা, এমনকি রাত অবধি কাজ করতে হয়। ইউএনও অতিরিক্ত সময় নিয়ে অফিস করায় কর্মচারী হয়ে তাদেরও আগে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এজন্য বাড়তি ভাতা না থাকলেও কাজ করতে হচ্ছে।
উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল হাকিম জানান, তাদের কাছে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসতেন বিভিন্ন ধরনের সেবা নিতে। এখন উপজেলা চেয়ারম্যান না থাকায় সব কাজের চাপ পড়েছে ইউএনওর ওপর।
বড়াইগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র ইসাহাক আলী বলেন, বড়াইগ্রাম পৌরসভা কার্যালয় উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় ১৪-১৫ কিলোমিটার দুরে। তারপরও তিনি সপ্তাহে দুই দিন পৌরসভায় অবস্থান করে নাগরিকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যদিও দুই দিনে সব কাজ শেষ করা যায় না, তারপরও তিনি যে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন সেটা প্রশংসার দাবিদার।
ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, একা এতোগুলো দায়িত্ব পালন করা কষ্টকর হলেও তা পালন করতে হবে। কাজ বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। সেজন্য অতিরিক্ত সময় দিয়ে হলেও নাগরিক সেবা ঠিক রাখার চেষ্টা করছি।
কাজের চাপ থাকলেও কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, অফিসের কর্মীদের নিয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে। দুর-দুরান্তের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন উপজেলা পরিষদে এসে যেন ভোগান্তিতে না পড়েন, সেজন্য স্টাফ সহ আমরা সবাই কাজ করছি।