সর্বশেষ সংবাদ :

শাসনের আড়ালে যে ভালোবাসা,সেই শিক্ষক আজও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে

নুরুজ্জামান,বাঘা :
একজন শিক্ষক অবসরে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা কখনো অবসর নেয় না। সময়ের স্রোতে শ্রেণিকক্ষ বদলে যায়, বেঞ্চ বদলে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, বদলে যায় না একজন প্রকৃত শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা । রাজশাহীর বাঘা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আড়ানী মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন প্রাত্তন শিক্ষক তার বাস্তব উদাহরণ।

 

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বয়স ১৬৮ বছর। প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৮ সাল। পুঠিয়ার রানী মনমোহিনীর নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য আলোকিত মানুষ গড়ে তুলেছে। সেই ইতিহাসের পাতায় নীরবে নিজের নাম লিখে রেখেছেন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ইংরেজি শিক্ষক প্রভাত কুমার নন্দী। প্রায় এক যুগ আগে শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। অথচ আজও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আড্ডা, পুনর্মিলনী কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্মৃতিচারণে বারবার ফিরে আসে একটি নাম, প্রভাত স্যার। যাঁকে একদিন ভয় পেত শিক্ষার্থীরা , আজ তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে প্রায় সকল শিক্ষার্থী।

 

 

স্কুলজীবনে প্রভাত কুমার নন্দী ছিলেন শৃঙ্খলার প্রতীক। ইংরেজি ক্লাসে অপ্রস্তুত হয়ে যাওয়া, হোমওয়ার্ক না করা কিংবা নিয়ম ভাঙার সুযোগ ছিল না। তাঁর কঠোরতা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে তখন ভয়ের কারণ ছিল। কিন্তু জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর সেই শিক্ষার্থীরাই উপলব্ধি করেছেন-শাসনের প্রতিটি মুহূর্তের আড়ালে ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের নির্মল ভালোবাসা। তাঁদের সুশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আন্তরিক চেষ্টা।

আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা দেশের বাইরে প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী অকপটে স্বীকার করেন, তাঁদের জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন এই শিক্ষক। ফেসবুকের একটি পোস্টে ফিরে এলো হাজারো স্মৃতি। সম্প্রতি প্রাক্তন শিক্ষার্থী হাবিবুল হক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাঁর প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট প্রকাশ করেন।

তিনি লিখেছেন, স্কুলজীবনের সেই শাসন, বকুনি, পরামর্শ আর অকৃত্রিম স্নেহ আজও তাঁর জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। পোস্টটি প্রকাশের পরপরই মন্তব্যের ঘর ভরে ওঠে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে। কেউ লিখেছেন-স্যারের হাতে শাস্তি পেয়েছি, কিন্তু আজ বুঝি, সেটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। আরেকজন মন্তব্য লিখেছেন,প্রভাত স্যার শুধু ইংরেজি শেখাননি, মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। আবার কেউ-কেউ লিখেছেন, আজও স্যারের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে সেই স্কুলের ছাত্র বলেই মনে হয়। শত শত মন্তব্যে যেন ফুটে উঠেছে একজন শিক্ষকের প্রতি একটি প্রজন্মের অকৃত্রিম ভালোবাসা।

সময়ের নিয়মে আজ বার্ধক্য এসেছে প্রভাত কুমার নন্দীর জীবনে। নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তিনি। চলাফেরায় লাঠির সহায়তা নিতে হয়। তবুও তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা এতটুকু কমেনি। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলেই তাঁর খোঁজ নেন। কেউ বাড়িতে গিয়ে দেখা করেন, কেউ ফোনে কথা বলেন, আবার কেউ দূরে থেকেও তাঁর সুস্থতা কামনা করেন। তাঁদের কাছে প্রভাত স্যার কেবল একজন শিক্ষক নন , তিনি একজন অভিভাবক, একজন পথপ্রদর্শক, একজন শিক্ষক, এবং একটি প্রজন্মের বিবেক ।

আড়ানীর একজন জনপ্রতিনিধি জানান, সমাজে একজন শিক্ষকের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় তাঁর অবসরের পর। পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতা হারিয়ে গেলেও যাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা অটুট থাকে, তিনিই প্রকৃত শিক্ষক। প্রভাত কুমার নন্দীর প্রতি তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ। আড়ানী মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫৮ বছরের ইতিহাসে অসংখ্য শিক্ষক এসেছেন, গেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ সময়কে অতিক্রম করে স্মৃতির অংশ হয়ে গেছেন। প্রভাত কুমার নন্দী তাঁদেরই একজন। তিনি হয়তো আজ আর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, ব্ল্যাকবোর্ডে ইংরেজি ব্যাকরণ লেখেন না, কিংবা আগের মতো দৃপ্ত পদক্ষেপে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটেন না। কিন্তু তাঁর শেখানো মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, সততা আর মানবিকতা আজও ছড়িয়ে আছে তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন ও কর্মে।

আড়ানীর প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর সাবেক মহা-পরিচালক শফিকুল ইসলাম মুকুট বলেন, মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে প্রভাত কুমার নন্দীর অবদান শুধু একজন ইংরেজি শিক্ষকের নয় , তিনি একটি প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষার বাতিঘর। তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তাঁদের বিশ্বাস, জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি তাঁরা পেয়েছেন এই প্রিয় শিক্ষকের কাছ থেকেই।

সানশাইন /শামি


প্রকাশিত: July 22, 2026 | সময়: 12:48 pm | Daily Sunshine