সিন্ডিকেটে অসহায় আলু চাষি 

সবুজ ইসলাম, রাজশাহী : 
রাজশাহীর পবা উপজেলার আলু চাষি হেলাল আলী তার ৯ বিঘা জমিতে আলু চাষের জন্য প্রস্তুত করেছেন। আলু বপণের জন্য বাজারে বীজ কিনতে গিয়ে তিনি দেখেন বীজের দাম বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। যে বীজের দাম গত বছরে ছিলো ৬০-৭০ টাকা সেই বীজের দাম এই বছর বেড়ে হয়েছে ১০০-১২০ টাকা। বীজের এই বাড়তি দামের কথা জানতে চাইলে আলু চাষি হেলাল আলী বলেন, “বাজারে যে বীজের দাম এত বাড়তি আগে জানলে হয়তো এভাবে আলু করতাম না। এমনিতেই এই বছর জমির টেন্ডারের টাকা বেশি তারপরে আবার সারের দামও বেশি, এখন আবার বীজ কিনতে আসলাম এখন বীজের দামও বেশি। সরকার যদি বীজ এবং সারের দামের বিষয়ে সরজমিনে দেখতো তাহলে আমরা আলু লাগাতে উৎপাদন খরচ কম হতো। বীজের ডিলাররা দাম বাড়িয়ে বাজারে সিন্ডিকেট তৈরী করেছে।”

 

 

সারাদেশে আলু উৎপাদনে অন্যতম প্রধান জেলা রাজশাহী। এ জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে আলু বীজ বপন। তবে এবার আলু চাষ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতিবস্তা আলু বীজ প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে। বীজের পাশাপাশি সারের দামও বেশি নেওয়া হচ্ছে।

 

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে এবার আলুর আবাদ লক্ষমাত্রা ৩৫০০০ হেক্টর, উৎপাদন লক্ষমাত্র ধরা হয়েছে ৯৪৫০০মেট্রিক টন। আলু উৎপাদনে বীজের চাহিদা ধরা হয়েছে ৫৭৭৫০ মেট্রিক টন। গত বছর রাজশাহীতে আলুর আবাদ হয়েছিল ৩৪৯৫৫ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন হয়েছিল ৯৪০৫৩২ মেট্রিক টন।
আলু উৎপাদন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হয় রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হিমাগারে বিপুল পরিমাণ বীজ আলু ও খাবার আলু সংরক্ষণ করা হয়। এই মুহুর্তে কৃষকরা মাঠে মাঠে আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে বিক্রি করছে বলে কৃষকদের কাছে থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়।

 

 

এবার ব্রাক সিডের গ্রানুলা, কারেজ, বারি আলু-৬২, এস্টিরিক্স, ডায়মন্ড, সানসাইন, ব্রাক আলু ৭ ও কার্ডিনাল জাতের এ, বি,সি গ্রেডের ৪০ কেজির বীজ আলু প্রতি বস্তা সাড়ে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি করছে বলে জানা যায়। অন্য বছরে বিএডিসি ও অন্যান্য কোম্পানির আলুর বীজের দাম ও চাহিদা কম থাকলেও চলতি বছরে এগুলো বীজ বাড়তি দামে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের কাছে বিক্রি হচ্ছে।

 

 

জেলার তানোর উপজেলার আলু চাষি সুজন মোল্লা বলেন,“এই বছর আলুর দাম বাড়তি থাকায় এবং চাষীরা আলু থেকে লাভের মুখ দেখায় সবাই একসাথে আলু করতে নেমেছে। গত বছর আলুর বীজের এত চাহিদা ছিলো না। কিন্তু এই বছর আলু লাগানোর জন্য বীজই পাওয়া যাচ্ছে না। যে বীজ গত বছর ৭০ টাকা কেজি করে কিনেছিলাম সেই একই বীজ এই বছর ১২০ টাকা করে কিনতে হচ্ছে। এত দাম দিয়ে আলু জমিতে লাগাতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে, বীজের দাম যদি কিছুটা সহনশীল পযার্য়ে থাকতো তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো।”

 

জেলার মোহনপুর উপজেলার বিদিরপুর গ্রামের কৃষক ময়েজ উদ্দিন বলেন, “সার ও বীজ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। পচিঁশশো টাকার বীজ কি করে চার হাজার টাকায় বিক্রি হয়? আমাদের সরকার কিংবা প্রশাসন কি এদেরকে ধরতে পারছে না, যারা এত বেশি দামে বীজ ও সার বিক্রি করছে। এত দামে আলু লাগিয়ে যদি দাম না পায় তাহলে তো আমরা মাঠে মার্ডার হয়ে যাবো।”

কেশরহাট এলাকার আলুর বীজ ডিলার আকতার আলী জানান চাহিদার তুলনায় বীজের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, “এইবছর আলু চাষে প্রচুর আগ্রহ। আমরা কোম্পানির নির্ধারিত দামেই বীজ বিক্রি করছি। চাহিদা বেশি থাকায় যারা বীজের জন্য অগ্রিম বুকিং দিয়েছিল তাদের আগে বীজ দিচ্ছি। বর্তমানে যে চাষী ১০০ বস্তা চাচ্ছে তাকে ৮০ বস্তা দিচ্ছি, এইভাবেই এখন বীজ বিক্রি চলছে। যারা ছোট ও অসৎ ব্যবসায়ী আছে তারাই সুযোগে দাম বেশি নিচ্ছে। বীজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কৃষি অফিসার এবং ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অবৈধ ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”

 

গত বছরের তুলনায় এই বছর আলু চাষ বেশি হওয়ায় বীজের কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছাঃ উম্মে ছালমা বলেন, “গত বছরের তুলনায় এই বছর আলু চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেশি। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও বীজের দাম বাড়তি রাখছে। আমরা সরজমিনে গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলছি তাদের বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছি। বিএডিসিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ বীজ রয়েছে কৃষকরা সেখান থেকেও সরকারী দামে বীজ সংগ্রহ করতে পারেন।”

সানশাইন / শামি

 

 


প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২৪ | সময়: ৫:২৪ অপরাহ্ণ | Daily Sunshine