, , ।
সবুজ ইসলাম: “সকাল ৮টার সময় এসে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছি। এখন বেলা ১২টা বাজে। তারপরেও সার পাইনি। আমাদের এখন সার দরকার। জমিতে সার না পেলে ফসল ভালো হবে না। নতুন ফসলের জন্য সার প্রয়োজন। কিন্তু সার পেতে আমাদের যে দূর্ভোগ হচ্ছে, এগুলো দেখবে কে?” –
কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ধূরইল গ্রামের কৃষক আব্দুর রব। শুধু আব্দুর রব নন, তারমতো আরো ৭০ থেকে ৮০ জন কৃষক সার নেওয়ার জন্য ডিলারের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তারা প্রয়োজনের তুলনায় সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন।
রাজশাহীতে শীতকালীন ফসলের আবাদ শুরু হয়েছে। জমি প্রস্তুত করে বীজ বপন ও চারা রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। কিন্তু প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় এই অঞ্চলের কৃষকদের সেই প্রস্তুতিতে বাধা তৈরি হয়েছে। ডিলারের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে এক-দুই বস্তা সার। কারও প্রয়োজন পাঁচ বস্তা, কেউবা ১০ বিঘা জমিতে চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন না। কোথাও এক বস্তা সার সংগ্রহ করতে রাতভর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার ১০ কেজি সার প্রয়োজন হলেও কিনতে হচ্ছে পুরো এক বস্তা।
কৃষকদের অভিযোগ, দেশে সারের সংকট নেই বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। বরাদ্দের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় অনেক ডিলারই কৃষকদের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন না। ডিলারকেন্দ্রিক বিতরণব্যবস্থার কারণে খুচরা দোকান থেকে প্রয়োজনমতো সার কেনা এবং বাকিতে কৃষি উপকরণ সংগ্রহের সুযোগও কমেছে। এতে সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন কৃষকেরা। সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে শীতকালীন ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।
রাজশাহীর পবা, পুঠিয়া ও মোহনপুর এবং নওগাঁর মান্দাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও সার বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজারের বিএডিসির ডিলার ওসমান আলী বলেন, অক্টোবর মাসে তিনি ডিএপি সার পেয়েছেন মাত্র ৬০ বস্তা। অথচ তাঁর এলাকায় প্রায় এক হাজার কৃষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০০ জনের সার প্রয়োজন হতে পারে। এত কম সার দিয়ে কৃষকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার দিতে পারছি না। এমনও হয়েছে, একজন কৃষককে মাত্র তিন কেজি সার দিতে হয়েছে। জমির পরিমাণ ও চাহিদার যে হিসাব ধরে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলছে না।’
মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট বিএডিসি ডিলার শফিকুল ইসলাম বলেন,‘কৃষকের চাহিদার তুলনায় তারা এখন সার বেশি নিচ্ছেন। অনেকে সামনে আলু লাগানোর জন্য বাড়িতে বাড়িতে মজুদ করছেন। কৃষকের বাড়তি সার নেওয়ার জন্য এখন সারের কিছুটা সংকট দেখা দিচ্ছে। আমার এখানে যে পরিমাণ চাহিদা তার থেকেও এখন বেশি সার কিনতে কৃষক লাইন ধরছেন।’
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের কৃষক আল আমিন ইসলাম বুধবার সকাল সাড়ে ৬টায় ডিলারের দোকানে সার কেনার জন্য লাইনে দাঁড়ান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি এক বস্তা ডিএপি ও এক বস্তা এমওপি সার পান। অথচ তাঁর প্রয়োজন ছিল দুই ধরনের পাঁচ বস্তা করে সার।
আল আমিন ইসলাম বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ, ফুলকপি ও রসুন চাষ করব। দুই ধরনের পাঁচ বস্তা করে সার দরকার। কিন্তু সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছয় ঘণ্টা পর পেয়েছি এক বস্তা করে। এই সার দিয়ে কীভাবে পুরো জমির আবাদ করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
একই এলাকার কৃষক রহমান আলীও প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, ডিলারের দোকান থেকে প্রত্যেক কৃষককে এক বস্তা করে ডিএপি ও এমওপি সার দেওয়া হচ্ছে। এতে এক বিঘা জমির চাহিদা মিটলেও বেশি জমিতে চাষাবাদ করা কৃষকেরা পড়ছেন বিপাকে।রহমান আলী বলেন, ‘এক বিঘা জমির জন্য যে পরিমাণ সার পাচ্ছি, তাতে কোনোমতে চলতে পারে। কিন্তু যাঁদের কয়েক বিঘা জমি রয়েছে, তাঁরা কীভাবে আবাদ করবেন? প্রয়োজনমতো সার না পেলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার সইপাড়া এলাকার কৃষক আজমন আলী বলেন, আগে খুচরা দোকান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার কেনা যেত। অনেক সময় বাকিতেও সার পাওয়া যেত। এখন ডিলারের দোকানে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে দিনের বড় একটি অংশ নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আগে ১০ কেজি সার প্রয়োজন হলে ১০ কেজিই কিনতে পারতাম। এখন এক ধরনের সার এক বস্তা নিলে অন্য ধরনের সারও এক বস্তা নিতে হচ্ছে। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনতে হচ্ছে, আবার টাকার চাপও বাড়ছে।’
কৃষক মো. সামসুল বলেন, আগে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি খরচ হলেও খুচরা দোকান থেকে সহজে সার পাওয়া যেত। এখন সেই সুযোগ কমে যাওয়ায় কৃষকদের ভোগান্তি বেড়েছে। তাঁর মতে, সার বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন না আনলে এই সংকটের সমাধান কঠিন হবে।
সারের সংকটের পাশাপাশি বাকিতে কৃষি উপকরণ কেনার সুযোগ কমে যাওয়ায় কৃষকদের আর্থিক চাপও বাড়ছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বহরমপুর গ্রামের কৃষক নজমুল হোসেন বলেন, আগে খুচরা দোকান থেকে সার ও কীটনাশক বাকিতে নেওয়া যেত। ফসল বিক্রির পর সেই টাকা পরিশোধ করতেন তাঁরা। এখন সার কিনতে হচ্ছে নগদ টাকায়। তিনি বলেন, ‘ফসলের আবাদ শুরুতেই সার ও অন্যান্য উপকরণের জন্য টাকা দরকার হয়। আগে বাকিতে নেওয়ার সুযোগ থাকায় কিছুটা সুবিধা হতো। এখন একসঙ্গে টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে। এতে কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক শামীম হোসেন জানান, আম ও ভুট্টা চাষের জন্য এক বস্তা সার সংগ্রহ করতে তাঁকে ডিলারের দোকানের সামনে সারা রাত কাটাতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় সার পেতে এমন অপেক্ষা কৃষকদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারসংকটে শুধু কৃষকেরাই নন, বিপাকে পড়েছেন খুচরা বিক্রেতারাও। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার খুচরা সার বিক্রেতা মো. শরীফ বলেন, আগে ডিলারদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে সার কিনে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করতেন তাঁরা। কিন্তু প্রায় সাত মাস ধরে সারসংকটের কারণে সেই ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ডিলাররাই কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে পারছেন না। সেখানে খুচরা বিক্রেতাদের জন্য সার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকেরা প্রয়োজনমতো সার কিনতে পারছেন না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএডিসি (সার) রাজশাহী অঞ্চলের যুগ্নপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ জুলফিকার আলী বলেন,‘রাজশাহীতে সারের কোন সংকট নেই। অক্টোবর মাসের সার ডিলারদের দেয়া শেষ হয়েছে। এখন সামনে নভেম্বর মাসের সার দেওয়া হবে। আশা করছি কিছুদিনের ভিতরেই তারা সার পাবেন।”
ডিলারদের দোকানে সারের জন্য কৃষকদের লম্বা লাইন এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘আসলে সারের কোন সংকট নেই। কৃষকের প্রয়োজনের তুলনায় সার বেশি কিনছেন সেজন্য সবাই পাচ্ছে না। যার ১ বস্তা প্রয়োজন সে ৩ বস্তা সার কিনছে। এভাবেই কৃত্রিম সংকট তৈরী হচ্ছে।’