, , ।
আক্কেলপুর প্রতিনিধি: কোলে ১১ মাসের নাতি। সঙ্গে ১৪ বছরের ছোট মেয়ে ও ২৩ বছরের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলে। খোলা ঈদগাহ মাঠে শরতের হিমেল বাতাস আর শেয়ালের আনাগোনা। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে বসতবাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনায় জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহের মেহরাবে (ঈমাম সাহেবের নামাজের স্থান) ছয় রাত কাটিয়েছেন বিধবা কোহিনুর বেগম। কখনও প্রতিবেশীর দেওয়া খাবার জুটেছে, কখনও থাকতে হয়েছে না খেয়ে। রাতে দুজন ঘুমালে অন্য দুজনকে জেগে থাকতে হতো। অবশেষে তাঁদের দুর্দশার খবর পেয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) শাহনাজ বেগমের নির্দেশে রাতেই পুলিশ গিয়ে কোহিনুরের সন্তানদের বাড়িতে তুলে দেয়। কিন্তু তালাকনামা দেখানোর কারণে ওই বাড়িতে ঠাঁই হয়নি কোহিনুরের।
আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের নুরনগর-২ গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি কোহিনুরের বিয়ে ও তালাকের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কোহিনুরের দাবি, স্বামীর সঙ্গে তাঁর পুনরায় বিয়ে হয়েছিল। তবে প্রতিপক্ষের দাবি, স্বামীর জীবদ্দশায় তাঁকে তালাক দেওয়া হয়েছিল।
গত শনিবার রাত ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিলকপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহের মেহরাবের ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে বসে আছেন তাঁরা। সাধারণত ঈদের নামাজের সময় ইমাম সেখানে অবস্থান করেন। সেই মেহরাবই হয়ে উঠেছিল তাঁদের রাত কাটানোর শেষ আশ্রয়। শরতের রাতের হিমেল বাতাস আর চারপাশে শেয়ালের আনাগোনার মধ্যে ১১ মাসের শিশুকে নিয়ে সেখানে থাকা ছিল কষ্টকর।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ১০ বছর আগে কাজের জন্য সৌদি আরব গিয়েছিলেন কোহিনুর বেগম। সেখানে থাকাকালে স্বামীকে টাকা পাঠাতেন তিনি। তাঁর দাবি, সেই টাকায় নুরনগর গ্রামে চার শতক জমির ওপর বসতবাড়ি নির্মাণ করা হয়। পরে স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এরপর মুঠোফোনে তাঁদের আবার বিয়ে হয় বলে দাবি করেন কোহিনুর। পরে তাঁর স্বামী আব্দুর রাজ্জাক মারা যান। দেশে ফিরে শ্বশুর তাজেম উদ্দিন ও সন্তানদের নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করছিলেন তিনি।
কোহিনুরের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সম্পা বেগমের বয়স ২২ বছর। কয়েক মাস আগে স্বামীর সঙ্গে তাঁরও বিচ্ছেদ হয়। বর্তমানে ১১ মাস বয়সী ছেলে আবু সাঈদকে নিয়ে মায়ের সঙ্গেই থাকেন তিনি। ছোট মেয়ে রেবেকা সুলতানার বয়স ১৪ বছর। ২৩ বছর বয়সী ছেলে সজিব বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।
কোহিনুরের দাবি, তাঁর শ্বশুর তাজেম উদ্দিন বসতভিটার জমি নাতি-নাতনিদের নামে লিখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে তিনি জানতে পারেন, বাড়িটি তাঁর দুই ননদের নামে দানপত্র করা হয়েছে। এ নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলার পর বিষয়টি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। পরে তাঁর শ্বশুর দুই ননদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন বলে জানান কোহিনুর।
পরিবারটির অভিযোগ, জমি নিয়ে ওই বিরোধের জেরে গত ৫ অক্টোবর কোহিনুরের ননদ ও তাঁর স্বামী আবুল কাশেম তাঁদের মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে বাড়িতে তালা লাগিয়ে শ্বশুর তাজেম উদ্দিনকে নিয়ে চলে যান তাঁরা। এরপর থেকে বাড়িতে ফিরতে না পেরে ঈদগাহের মেহরাবে আশ্রয় নেন কোহিনুর ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
এ ঘটনায় কোহিনুরের বড় মেয়ে সম্পা বেগম গত ৫ অক্টোবর আক্কেলপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে আবুল কাশেম সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বাড়িতে প্রবেশ, মারধর ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কোহিনুর বেগম বলেন, আমার ননদ ও তাঁর স্বামীর সঙ্গে বসতবাড়ির জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। তাঁরা আমাদের মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর থেকে বাস্তুহারা হয়ে ঈদগাহে অবস্থান করছি। রাতে চারজনের মধ্যে দুজন ঘুমাই, আর দুজন জেগে থাকি। কিছুক্ষণ পর অন্য দুজন ঘুমাই, বাকি দুজন জেগে থাকি। এভাবেই রাত কাটে। ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। প্রতিবেশীদের কেউ খাবার দিলে খাই, না দিলে কোনো কোনো বেলা না খেয়েই থাকতে হয়।
তিনি আরও বলেন, রাতে পুলিশ এসে আমার সন্তানদের বাড়িতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু তালাকনামা দেখিয়ে আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমি বিদেশে থাকাকালে মুঠোফোনে আমাদের আবার বিয়ে হয়েছিল। এখন পাশে এক আত্মীয়ের বাড়িতে একা আশ্রই নিয়েছি।
প্রতিবেশী সোহাগী আক্তার বলেন, ঘটনার পর থেকে তাঁরা বাড়িছাড়া হয়ে পড়েছিলেন। আমরা সাধ্য অনুযায়ী তাঁদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। কোনো উপায় না পেয়ে গত ছয় রাত ধরে ঈদগাহের মেহরাবে রাত কাটিয়েছেন তাঁরা।
তবে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবুল কাশেম। তিনি বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁদের মারধর করা হয়েছে, এ অভিযোগ সত্য নয়। সেদিন কোহিনুর ও তাঁর সন্তানেরা আমার শ্বশুর ও শাশুড়িকে মারধর করছিলেন। খবর পেয়ে আমার স্ত্রীসহ সেখানে গেলে তাঁরা আমাদেরও মারধর করেন। পরে শ্বশুর-শাশুড়ির নিরাপত্তার জন্য তাঁদের আমাদের বাসায় নিয়ে এসেছি। কোহিনুরের স্বামী বেঁচে থাকতেই তাঁকে তালাক দিয়েছিল। সে কারণে এই বাড়িতে তার কোন অধিকার নাই।
তিলকপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ পিন্টু বলেন, ঘটনার পর তাঁরা আমাদের কাছে এসেছিলেন। উভয় পক্ষকে ডেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। সমাধান না হওয়ায় তাঁরা থানার আশ্রয় নেন। কয়েক দিন বাইরে রাত কাটাচ্ছিলেন। গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে সার্বক্ষণিক তাঁদের খোঁজখবর নিয়েছি। গত রাতে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে বাড়িতে তুলে দিয়েছে।
আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী মাসুদ বলেন, জমিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে পরিবারটি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল। অভিযোগটি তদন্ত করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিরোধের সমাধান হয়নি।
শনিবার রাতে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় ঈদগাহের মেহরাব থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয়। পরে অভিযুক্ত পক্ষের লোকজনকে ডেকে বাড়ির তালা খোলা হয়। কোহিনুরের সন্তানদের বসতঘরে তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে তালাকনামা দেখানো হলে তাঁকে বাড়িতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি।