সর্বশেষ সংবাদ :

পদ্মায় নৌকাডুবিতে প্রাণহানী ভ্রমনে তবুও নেই সর্তকতা

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর পদ্মা নদীতে একের পর এক নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণহানির পরও বদলায়নি নদী ভ্রমণের চিত্র। লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই প্রতিদিন শত শত মানুষ ভরা পদ্মায় নৌকায় চড়ে ভ্রমণ করছেন। নৌকাচালকদের অনেকের কাছেই নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই, আবার কোথাও লাইফ জ্যাকেট থাকলেও তা যাত্রীদের ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না। নদীর উত্তাল ঢেউ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনিয়ন্ত্রিত নৌকা চলাচল এবং প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
‎মঙ্গলবার পদ্মা নদীতে ঘাসবোঝাই একটি নৌকা ডুবে বাবা ও ছেলে নিখোঁজ হন। দুই দিন পর নদী থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত বছর রাজশাহীর পদ্মায় বরযাত্রীবাহী নৌকা ডুবে নতুন বউসহ কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকেও শিক্ষা নেওয়ার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
‎সরেজমিনে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভরে ওঠা পদ্মা নদীকে ঘিরে রাজশাহীতে এখন জমে উঠেছে নদীকেন্দ্রিক বিনোদন। নগরীর টি-বাঁধ, আই-বাঁধ, পদ্মা গার্ডেন, মুক্তমঞ্চসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিড় করেন হাজারো মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরাও নৌকায় ঘুরে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
‎কিন্তু এই আনন্দ ভ্রমণের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা। অধিকাংশ নৌকাতেই দেখা যায় না লাইফ জ্যাকেট। কোথাও কোথাও নৌকায় কয়েকটি লাইফ জ্যাকেট থাকলেও সেগুলো ব্যবহার না করেই যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। নৌকায় ওঠার সময় যাত্রীদেরও নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না।
‎আই-বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একই নৌকায় নারী, পুরুষ, শিশু মিলিয়ে অনেক যাত্রী ভ্রমণ করছেন। ছোট ছোট শিশুরাও ছিল নৌকায়, কিন্তু কারও গায়েই লাইফ জ্যাকেট নেই। নদীতে তখন প্রবল স্রোত ও ঢেউ। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ছে নৌকার গায়ে। তারপরও কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই চলছে নৌকা ভ্রমণ।
‎অনেক নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি যাত্রী তোলা হচ্ছে। ফলে নৌকাগুলো একদিকে হেলে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা দলবেঁধে নৌকায় উঠে ছবি তোলা, হৈ-হুল্লোড় ও একপাশে জড়ো হওয়ায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
‎নৌকা ভ্রমণে আসা সুমাইয়া নামের এক নারী বলেন, “অল্প সময়ের জন্য ঘুরেছি, তাই এসব নিয়ে ভাবিনি। কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয়নি।”
রাকিব নামের আরেক ভ্রমণকারী বলেন, “নৌকার চালকরা লাইফ জ্যাকেট দেয় না, আমরাও চাই না। এভাবেই তো সবাই ঘুরে।” এক নৌকাচালক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই এভাবেই নৌকা চালাই। কোনো সমস্যা হয়নি।” মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এত কিছু জানি না। যাত্রীরাও তো কিছু বলে না।”
‎অন্য এক নৌকাচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নৌকায় লাইফ জ্যাকেট আছে। কিন্তু আমরা নিজেরাও পরি না, যাত্রীদেরও দিই না। আসলে অভ্যাস নেই। সামনে থেকে বিষয়টি খেয়াল রাখব।”
‎খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু আই-বাঁধ নয়; টি-বাঁধ, পদ্মা গার্ডেন, মুক্তমঞ্চসহ পদ্মা নদীর প্রায় সব বিনোদনকেন্দ্রেই একই চিত্র। কোথাও নিয়মিত নিরাপত্তা তদারকি নেই। নৌকায় কতজন যাত্রী উঠছে, আবহাওয়া অনুকূল কি না, নদীর স্রোত কতটা বিপজ্জনক—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারিরও অভাব রয়েছে।
‎স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতে নৌকা চলাচলের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। কখন নৌকা চলবে, কখন বন্ধ থাকবে কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় নৌযান বন্ধের নির্দেশনা বাস্তবে মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। ফলে অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও নৌকা চলাচল অব্যাহত থাকে।
‎নদীপাড়ের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বর্ষা মৌসুমে পদ্মার স্রোত অনেক বেশি থাকে। হঠাৎ দমকা হাওয়া কিংবা বড় ঢেউ উঠলে ছোট নৌকা সহজেই নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে লাইফ জ্যাকেট না থাকলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।


প্রকাশিত: August 1, 2026 | সময়: 4:04 am | সুমন শেখ