সর্বশেষ সংবাদ :

বর্ষায় বাড়ছে নদী দূষণ: তুলসীগঙ্গার তীরে ময়লার ভাগাড়, দূষণে বিপন্ন নদী ‎

মওদুদ আহম্মেদ, আক্কেলপুর: ‎জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তুলসীগঙ্গা নদীর একাংশ এখন বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পৌর শহরের কলেজ কাঁচা বাজার সংলগ্ন ফুটসেতুর নিচে ও নদীর তীরে প্রতিদিন অবাধে ফেলা হচ্ছে বাজারের ময়লা-আবর্জনা। পঁচা সবজি, ডাবের খোসা, প্লাস্টিক, পলিথিন, মাছ-মাংসের উচ্ছিষ্ট সহ বিভিন্ন ধরনের জৈব ও অজৈব বর্জে নদীর তীর ভরে গেছে। এখন বর্ষা মৌসুমে তুলসীগঙ্গা নদী কানায় কানায় পানি পূর্ণ থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই নদীতীরে ফেলে রাখা এসব বর্জ্য দ্রুত পানিতে মিশে যাচ্ছে। ফলে পানি দূষণের পাশাপাশি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
‎সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলেজ কাঁচা বাজারের পাশে ফুটসেতুর পূর্ব পাশে তুলসীগঙ্গা নদীর তীর জুড়ে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে নানা ধরনের বর্জ্য। কোথাও পঁচা সবজি ও ফলের উচ্ছিষ্ট, কোথাও ডাবের খোসার স্তুপ, আবার কোথাও ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য। বর্ষার কারণে নদীর পানি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
নদীতীরের সঙ্গে পানির দূরত্ব প্রায় না থাকায় বৃষ্টির পানি কিংবা সামান্য স্রোতেই বর্জ্য গুলো সরাসরি নদীতে ভেসে যাচ্ছে। অনেক প্লাস্টিক, পলিথিন ও পচনশীল বর্জ্য ইতোমধ্যেই পানির ওপর ভাসতে দেখা গেছে। এতে নদীর পানি ক্রমেই দূষিত হয়ে পড়ছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। ফুটসেতু ও পাশের সড়ক দিয়ে চলাচলকারী পথচারী, শিক্ষার্থী ও বাজারে আসা ক্রেতাদের অনেকেই নাক চেপে চলাচল করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগের অভাবে নদীর তীরই ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না থাকায় দিন দিন বর্জ্যের স্তূপ বড় হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব ময়লা নদীতে মিশে দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি পচনশীল বর্জ্য থেকে মাছি, মশা ও বিভিন্ন রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটায় আশপাশের বাসিন্দারা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
‎নদীপাড়ের কেশবপুর মহল্লার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার বলেন, একসময় তুলসীগঙ্গার পানি ছিল স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। মানুষ নদীর পানি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করত। এখন নদীর পাড়ে গেলেই দুর্গন্ধে দাঁড়ানো যায় না। বাজারের প্রায় সব ময়লাই এখানে এনে ফেলা হয়। বৃষ্টি হলে সেগুলো নদীতে মিশে যায়। এতে নদী যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি পরিবেশও ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে।
ফুটসেতু দিয়ে চলাচলকারী স্থানীয় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন শত শত মানুষ এই পথ ব্যবহার করে যাতায়াত করেন। কিন্তু দুর্গন্ধে কয়েক মিনিটও দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। গরম ও বর্ষাকালে অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একটি পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন দৃশ্য সত্যিই দুঃখজনক। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আন্দোলনের উদ্যোক্তা রতন মন্ডল বলেন, নদীতে আর্বজনা বিশেষকরে মুরগীর বিষ্টা, পশু ও মুরগীর রক্ত, নাড়ীভুঁড়ি ফেলার ফলে জৈব পদার্থ, রোগ-জীবানু, ব্যাকটেরিয়া, অণুজীব প্রচুর বেড়ে যায়। এতে পানির মাধ্যমে টাইফয়েড, কলেরাসহ মারাত্মক রোগবালাই দূরদূরান্তে ছড়ানোর পাশাপাশি পানির জৈবিক অক্সিজেনের চাহিদা এবং রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা খুবই বৃদ্ধি পায়।
পানির এই জৈব দূষণের পরিমাণ যত বেশি, পানির গুণগত মান তত খারাপ, কারণ জৈব পদার্থ, অণুজীবরাই সব অক্সিজেন ব্যবহার করে ফেললে মাছ বা অন্যান্য জলজ প্রাণী অক্সিজেন পাবে না। ফলে দূষিত জৈবপদার্থ, মিথেন গ্যাস বৃদ্ধি, অক্সিজেন সংকট ও রোগজীবাণুর কারণে মাছসহ অনেক প্রাণী বিলুপ্তির এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই নদী লোকালয় হতে দূরে একটা বর্জ্য শোধনাগারে তৈরি করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নদী দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি।
জয়পুরহাট জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, নদী, খাল বা জলাশয়ে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব বর্জ্য দ্রুত নদীতে মিশে পানি, পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। তাই দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নদী দূষণ করলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক আশিক-উর রহমান বলেন, কলেজ কাঁচাবাজার এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা রয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। দ্রুত জমে থাকা ময়লা অপসারণ করা হবে। আমরা বর্জ্য ডাম্পিং প্লান্ট তৈরী করার পরিকল্পনা করছি। একই সঙ্গে নির্ধারিত স্থান ছাড়া কোথাও যাতে বর্জ্য ফেলা না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, নদীর পরিবেশ রক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পৌরসভা আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাজারের ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না। সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, তবেই তুলসীগঙ্গাকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।


প্রকাশিত: July 16, 2026 | সময়: 5:03 am | সুমন শেখ