সোমবার, ৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুর: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি গ্রামে চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পরদিন থানায় মামলা করতে গেলেও মামলা নেননি পুলিশ। অজ্ঞাত কারণে ভিকটিম শিশুর পরিবারকে থানা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। সেদিনের পর থেকে ভয় ও আতঙ্কগ্রস্থ ভিকটিমের পরিবারের লোকজন আর মুখ খুলছে না।
অন্যদিকে, এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ওই এলাকার প্রভাবশালী মহল। গ্রাম্য সালিশে ফায়সালা করে দেবার আশ্বাস দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে একধরনের কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে ভিকটিম শিশুর পরিবারকে। ঘটনাটি দাওকান্দি গ্রাম ছাপিয়ে এখন পুরো জয়নগর ইউনিয়নবাসীর আলোচনার প্রধান খোরাক।
অভিযুক্ত কিশোর (১৪) একটি কওমী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে বলে জানা গেছে। এছাড়াও সম্পর্কে ভিকটিম শিশুর আপন চাচাতো ভাই।
ঘটনার পর বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে অভিযুক্ত কিশোর। অভিযুক্ত কিশোর এর আগেও ভিকটিম শিশুর বড় বোনের গোসল করার দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও করেছিলো বলে সূত্রটি জানায়।
অভিযুক্ত যুবকের বাবার বিরুদ্ধেও একই ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘটনাও ধামাচাপা পড়ে অজ্ঞাত কারণে। অভিযুক্ত কিশোর ও তার বাবার নৈতিকস্থলন এবং দুষ্কর্মের ঘটনা পুরো গ্রামবাসী জানলেও প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে প্রাণভয়ে মুখ খুলেন না কেউ। সম্প্রতি চার বছরের শিশুর সাথে ঘটে যাওয়া পাশবিক ঘটনার পর ক্ষোভে ফূঁসছে গ্রামবাসী। ভয় কাটিয়ে সাহস নিয়ে গ্রামের মানুষ এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
পিতা-পুত্রের আগের ওইসব ঘটনার আদলে এই ঘটনাও ধামাচাপা দিতে একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন স্থানীয় নেতা ব্যপক তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
থানায় মামলা না নিয়ে বের করে দেয়া, ভিকটিম শিশুর পরিবারের লোকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনঠাসা করে রাখা এবং এই ঘটনায় গণমাধ্যমে কোনো ধরনের সংবাদ প্রকাশ যাতে না হয় সে জন্য মোটা অংকের চুক্তিও হয়েছে প্রভাবশালী মহলের সাথে। চুক্তির বেশিরভাগ অংশ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানা গেছে। পুরো বিষয়টি মিটমাট হয়ে গেলে চুক্তির বাঁকী অংশের লেনাদেনা চুকানো হবে বলেও জানা গেছে।
ভিকটিমের প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীর দাবি, বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে কিভাবে পার পায় তারা। এসব কারণে গ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাস করা দিনকে দিন দুর্বিসহ হয়ে পড়ছে। পিতা-পুত্রের নৈতিকস্থলন ও সামাজিক অবক্ষয়ের লাগাম টেনে ধরে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবিও জানান তারা।
ঘটনার পর নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, গত শনিবার ৬ জুন বিকেলে উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের দাওকান্দি গ্রামের কারিগর পাড়ায় ভিকটিম শিশুকে দেখে কিভাবে ঘুড়ি ওড়াতে হয় তা শেখাবে এবং ঘুড়িটি ভিকটিমকে দিয়ে দিবে, এমন প্রলোভন দেখায় অভিযুক্ত কিশোর। এরপর পাটক্ষেতের মধ্যে নিয়ে হাত-পা বেঁধে বিবস্ত্র করে ধর্ষণ করা হয়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে সূত্রটি জানায়, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় ভিকটিম শিশুকে খুঁজতে বের হয় তার বড় বোন। বাড়ির আশেপাশে না পেয়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতেও খোঁজ নিয়ে ভিকটিম শিশুকে খুঁজে না পাওয়ায় বড় বোনের মনে খটকা লাগে। একপর্যায়ে নিকটবর্তী পাটক্ষেতের কাছে গিয়ে ভিকটিমের গোঙ্গানির আওয়াজ পেয়ে পাটক্ষেতের মধ্যে গিয়ে দৃশ্যটি দেখে ফেলে। এ সময় পালিয়ে যায় ওই কিশোর।
পরবর্তীতে ভিকটিমকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলে পুরো ঘটনার বিবরণ মাকে জানায়। ভিকটিমের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ শুনে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ধস্তাধস্তির চিহ্ন দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ভিকটিমের মা। কান্না আর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে গেলে ঘটনাটি মূহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি প্রতিবেশীদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ঘটনাটি এক কান-দুই কান করে পুরো গ্রামে রটিয়ে পড়ে।
ঘটনার পরদিন গত রোববার ৭ জুন থানায় মামলা দায়ের করতে যায় ভিকটিম শিশুর মা। তবে কিচ্ছুক্ষণ বাদে অজ্ঞাত কারণে থানা থেকে বের হয়ে বাড়ি চলে যায়। এরপর থেকে আর ভয়ে মুখ খুলছেন ভিকটিম শিশুর পরিবারের লোকজন।
গোপনে খবর পেয়ে পুলিশের সাদা পোশাকে থাকা গোয়েন্দা শাখার একাধিক টিম ভিকটিম শিশুর পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলেছেন। তারা ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন। তবে কি কারণে থানা পুলিশ মামলা নেননি, কিংবা ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের না করার বিষয়ে একগাদা প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত কিশোরের বাবাকে ফোন করা হলে প্রথমে কোনো ঘটনাই ঘটেনি বলে দাবি করেন।
কৌশলে ফায়সালা করে নেয়ার পরামর্শ দিতেই এবার তিনি বলেন, বিষয়টি তেমন কিছুনা, পারিবারিক বিষয়। তাই বাচ্চাদের ডেকে হাত ধরে মিটমাট করে দেয়া হয়েছে।
তার ছেলে (অভিযুক্ত কিশোর) কোথায় আছে জানতে চাইলে? প্রথমে সেই তথ্যও জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, সমস্যা কি? কি জন্য এসব জানতে চাচ্ছেন। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেও পরবর্তীতে বলেন, আমার ছেলে কওমী মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে। সে মাদ্রাসায় আছে। তবে কোন কওমী মাদ্রাসায় আছে বা পড়াশোনা করছে সেটাও তিনি জানাননি।
এর আগেও আপনার ছেলের (অভিযুক্ত কিশোর) বিরুদ্ধে গোপনে গোসল করার দৃশ্য ভিডিও করার অভিযোগ আছে। আপনার বিরুদ্ধেও একই ধরনের স্পর্শকাতর অভিযোগ রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব মানুষের ষড়যন্ত্র, আমি এখন কাজে আছি এবং চরম ব্যাস্ত আছি বলেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একই নম্বরে ফের কল করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
দুর্গাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকারের সাথে কথা বলতে থানার সরকারি ফোনে কল করা হলে থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম কল গ্রহণ করে বলেন, ওসি স্যার ছুটিতে আছেন। এখন আমি দায়িত্বে আছি।
প্রসঙ্গটি নিয়ে তার সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, এখন নামাজের সময়। মসজিদে আযান দিয়েছে। ওসি স্যার হিন্দু, নামাজ পড়েন না। এই জন্যই এখন (নামাজের সময়) ফোন দিয়েছেন তাই না? এমন পাল্টা প্রশ্ন করে নামাজ শেষে কথা বলবো বলে তিনি ফোন রেখে দেন।
মাগরিব নামাজ শেষে ফের তাকে ফোন করা হলে, তিনি বলেন, ঘটনা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল না। তাই ঘটনা সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করবে না।