মঙ্গলবার, ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মিজানুর রহমান, চারঘাট: রাজশাহীর আমবাগানগুলো এখন ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। গাছে গাছে ঝুলছে পাকা আম, বাগানে চলছে সংগ্রহ, বাছাই ও বাজারজাত করণের ব্যস্ততা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর আমের মোকাম। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও চাষিদের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। কারণ, বাগানে ফলন ভালো হলেও লাভের অঙ্ক ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।
চাষিদের অভিযোগ, এখন আম উৎপাদনের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজারজাতকরণ। এক মণ আম বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে ক্যারেট, বস্তা, কাগজ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন খরচে। ফলে ভরা মৌসুমেও অনেক কৃষক কাঙ্খিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় প্রায় ৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন।
বর্তমানে চারঘাট সহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। কিন্তু এক মণ আম ঢাকায় পাঠাতে প্যাকেজিং ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা, থেকে ২ হাজার ২০০ শ টাকা।
চাষিদের হিসাবে, শুধু একটি প্লাস্টিকের ক্যারেট কিনতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ২৬০ টাকা থেকে ৩৬০ টাকা। প্লাস্টিকের বস্তা ৩০ টাকা, পুরোনো পত্রিকার কাগজের কেজি ৮০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে প্যাকেটজাতকরণে শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়।
অন্যদিকে কুরিয়ার সার্ভিসে ঢাকায় আম পাঠাতে প্রতি কেজিতে ১৩ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। হোম ডেলিভারি নিতে হলে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রতি কেজিতে প্রায় ২৫-৩০ টাকা। ফলে ঢাকায় সরাসরি ক্রেতার কাছে আম পৌঁছে দিতে গিয়ে চাষি ও ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের খরচ গুনতে হচ্ছে।
উপজেলার আমচাষি আব্দুল মান্নাফ বলেন, বছরজুড়ে বাগানের পরিচর্যা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বহন করি। কিন্তু মৌসুমে এসে দেখি আমের দাম কম, আর প্যাকেজিং খরচ আকাশছোঁয়া। এক মণ আম বিক্রি করে যে টাকা পাই, তার বড় অংশই ক্যারেট, বস্তা, কাগজ ও পরিবহনে চলে যাচ্ছে। লাভ বলতে তেমন কিছুই থাকে না।
নন্দনগাছী এলাকার আমচাষি আবু সাঈত হিরু জানান, আমের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারদর আশানুরূপ নয়। বর্তমানে এক মণ আম জাত ভেদে ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ঢাকায় পাঠাতে গেলে প্যাকেজিং ও পরিবহন খরচ প্রায় একই পরিমাণ হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক চাষি সরাসরি বাজারে কমদামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্যাকেজিং উপকরণের দাম গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকজাত পণ্য, কাগজ এবং পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমের বাজারে।
সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। কিন্তু ক্যারেট, বস্তা, কাগজ ও কুরিয়ার খরচ কমেনি, বরং বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। ফলে যেসব পাইকারি ক্রেতা আম কিনছেন তারাও পরিবহনের হিসেব করে আমের দাম কম বলছেন। এতে ব্যবসায়ী ও চাষি, দুই পক্ষই চাপে রয়েছেন।
নিমপাড়া এলাকার আম চাষি মজনু বলেন, ঢাকায় যারা পাইকারি আম কিনছেন তারাও ক্যারেট সহ প্যাকেজিং ও পরিবহনের হিসেব করে আম কিনছেন। এছাড়া এবার ফলনও বেশি, ঈদের কারণে ৬দিন বাজার বন্ধ ছিল। অনেক গাছে আম পেকে যাচ্ছে। চাষিরা একযোগে আম বাজারে তুলছেন ফলে আমের দাম কমে গেছে।
ক্যারেট ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান আশা বলেন, সারা বছর ফলের দোকান থেকে দুইটা-পাঁচটা করে ক্যারেট কিনে জমিয়ে রাখি আমের মৌসুমে একটু লাভের আশায়। তবে অন্যবার দাম কিছুটা কম ছিল। এবার প্রতিটি ক্যারেটের দাম ১০০ টাকারও বেশি বেড়েছে। আমরা নিজেরাও বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ম্যানেজার বলেন, জ্বালানি, পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কুরিয়ার চার্জ সমন্বয় করতে হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় আম পাঠাতে প্রতি কেজিতে ১৩ থেকে ১৬ টাকা খরচ হচ্ছে। আবার বাসা পর্যন্ত হোম ডেলিভারি দিতে হলে অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়। ফলে ভাড়া আগের তুলনায় বেশি মনে হলেও বাস্তবে পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, ‘অনলাইন বিপণন, সমবায়ভিত্তিক বাজারজাতকরণ এবং সরাসরি বিক্রয় ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে কৃষক লাভবান হবেন। পাশাপাশি প্যাকেজিং ও পরিবহন খরচ ন্যায্যতার ভিত্তিতে নেয়া হলে কৃষক উপকৃত হবে।