ঈদ আনন্দে বিষাদ : টাঙ্গাইলে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহতের ১০ জনই মান্দার

স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ: নিঝুম রাত পেরিয়ে তখন সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশটা শান্ত, স্নিগ্ধ। ঢাকার কর্মব্যস্ত জীবন পেছনে ফেলে উত্তরবঙ্গের একদল মানুষ বুঁদ হয়ে ছিলেন বাড়ি ফেরার স্বপ্নে। আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা, তারপরই স্বজনদের উষ্ণ আলিঙ্গন। কিন্তু মুহূর্তের একটি ঝাঁকুনি, আর তার পরপরই সব স্বপ্ন-উল্লাস রূপ নিল গগনবিদারী আর্তনাদে। লোহার রডের নির্মম ভারে পিষ্ট হয়ে নিভে গেল ১৭টি তাজা প্রাণ। এদের মধ্যে ১০ জনই নওগাঁর মান্দা থানার।
সোমবার ২৫ মে ভোর সোয়া ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে টাঙ্গাইলের যমুনা সেতু পূর্ব থানাধীন কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল ও যোগারচর এলাকার ১৮ নম্বর ব্রিজের কাছে ঘটে যায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। উত্তরবঙ্গগামী একটি রডবোঝাই ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ট-১২-৫৪৭১) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে খাদে উল্টে পড়লে এই ট্র্যাজেডি ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ জনে। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন।
ঈদ বা উৎসবের মৌসুমে দূরপাল্লার বাসের টিকিটের সংকট কিংবা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে প্রতিবারই এক শ্রেণির নিম্নআয়ের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খোলা ট্রাকে চড়ে বসেন। এই যাত্রীরাও তেমনি ট্রাকে বোঝাই করা লোহার রডের ওপর বসে রওনা হয়েছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তাদের অধিকাংশই ঘুমিয়ে ছিলেন।
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার পার হওয়ার আগেই চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে উল্টে যায় পুরো ট্রাকটি। লোহার ভারী রডের নিচে চাপা পড়লে মুহূর্তেই মানুষের শরীরগুলো দুমড়েমুচড়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ঘুমন্ত অবস্থায় থাকার কারণে বাঁচার জন্য একটু হাত-পা নাড়ার সুযোগও পাননি অনেকে। ফলে হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে ছোটেন টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার, যমুনা সেতু পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার ফুয়াদ রুহানি, উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল হান্নান ও তাদের দল। উদ্ধারকাজে দ্রুত যোগ দেয় এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস, হাইওয়ে পুলিশ এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে উদ্ধারকারীরা যখন ক্রেন আর রেকার দিয়ে ভারী রডগুলো সরাচ্ছিলেন, তখন বের হয়ে আসছিল একের পর এক নিথর দেহ। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক কর্মী জানান, ‘দৃশ্যটা এতটাই ভয়াবয় ছিল যে স্থির থাকা কঠিন। অনেকেই হয়তো ঘুমন্ত অবস্থাতেই রডের নিচে চাপা পড়ে দম আটকে মারা গেছেন।’
যমুনা সেতু পূর্ব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানি জানান, ‘খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিস ও বিবিএ-র সহায়তায় উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ১৫টি মরদেহ উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে, পরবর্তীতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭ জন হয়। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে।
নিহত ও আহতদের অনেকেরই বাড়ি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যে কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহতের মধ্যে ১০ জনের নাম ও পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তারা সবাই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই সাতজন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক জিয়া (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আব্দুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮) মাইনুর ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০), পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা সবাই ফেরিওয়ালা ছিলেন। তারা সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। পাশাপাশি নারীদের চুল ও পুরোনো মোবাইল ফোন সংগ্রহের কাজও করতেন। জীবিকার তাগিদে তারা দীর্ঘদিন ধরে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে ভাড়া বাসায় থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তারা রাজশাহীগামী একটি রডবোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়।
একই সময়ে সাতজনের মৃত্যুর খবরে ভারশোঁ ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি ও বুকফাটা কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। স্থানীয় লোকজনকে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে দেখা গেছে।

রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের ফিরোজ হোসেন জানান, উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে এ এলাকার শতাধিক যুবক বছরজুড়ে হরেক পণ্যের ব্যবসা করেন। ঈদের সময় বাসে বাড়ি ফিরতে জনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা গুনতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে অনেকেই পণ্যবাহী ট্রাকে যাতায়াত করেন। নিহতরাও একইভাবে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন।
হঠাৎ দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা খাতুন। একমাত্র মেয়ে রাহী মনিকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে স্বজনেরাও কান্না থামাতে পারছেন না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাবিনা খাতুন বলেন, ‘বাড়ি ফেরার পথে স্বামীর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদী কেনার কথাও বলেছিল। রাত ১০টার দিকে শেষ কথা হয়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই।’
এ বিষয়ে মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত সবার পরিচয় এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ।


প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬ | সময়: ২:৫২ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ