সর্বশেষ সংবাদ :

জয়পুরহাটের পাটালি গুড় যাচ্ছে সারাদেশে

মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: প্রতি বছরের মতো এবারও জয়পুরহাটে গাছিদের খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ এবং সেই রস থেকে গুড় তৈরির ধুম পড়ে গেছে। প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে তারা ভোর রাত থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ শুরু করেন। এরপর খুব সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় সেই রস থেকে গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ।
এ ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলের খেজুরের রস তুলনামুলক ভাবে বেশি মিষ্টি হওয়ায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে রস পান করতে কিংবা বাসা-বাড়ীর জন্য কিনতেও আসেন। আগতরা যাবার সময় খাঁটি গুড় সঙ্গে নিয়ে যান।
তবে এ বছর স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে কাঁচা রস খেতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রয়োজনে রস ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে জয়পুরহাট জেলায় ২৭৫ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অন্তত ৬৫০ জন গাছি জয়পুরহাটে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরী করতে এসেছেন। তীব্র শীত উপেক্ষা করে তারা ভোর রাতে গাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু করেন এবং এরপর টিনের বড় তাওয়ায় ঢেলে তা আগুনে জ্বাল দেওয়া হয় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। এরপর তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালি ও লালি গুড়। আর সেই গুড় বিক্রি হচ্ছে জয়পুরহাট সহ আশপাশের অন্তত ৫/৬ টি জেলায়। অনেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন শীতের পিঠাপুলি খাওয়ার জন্য। প্রকার ভেদে প্রতি কেজি গুঁড় বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। আর খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে ৫০/৬০ টাকা কেজি।
গত ৮/১০ বছরের মতো এ বছরও জয়পুরহাট শহরতলীর কুঠিবাড়ী ব্রীজ এলাকায় অন্তত শতাধিক গাছ গড়ে তুলেছেন রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কারখানা।
এখানকার গাছি আব্দুর রউফ জানালেন, প্রতিদিন ভোর রাত থেকেই আমরা গাছে উঠে বস সংগ্রহ শুরু করি। এরপর সকালে সেই রস বড় তাওয়ায় ঢালা হয় এবং এরপর ৪ ঘন্টার মতো জ্বাল দিতে হয়। এক পর্যায়ে ঘন হলে সেই রস নামিয়ে পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করা হয়। এরপর এই গুড় বাজারে বিক্রি করি। অনেকে এখান থেকে কিনে নিয়ে যায়।
গুড় বিক্রেতা আফছার মন্ডল জানালেন, এখানে অনেকে সকাল বেলা রস খেতে এসে তারা নিজের চোখে গুড় তৈরি দেখে তা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ‘পাটালি গুড় ভালোটা ৪০০ টাকা আর একটু নরমালটা ২৫০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। লালি গুড় ভালোটা ৪৫০ টাকা ও নরমালটা ২৫০ টাকা কেজি। এ ছাড়া রস বিক্রি হচ্ছে ৫০/৫০ টাকা কেজি। আমাদের উৎপাদিত গুড় এ বছর ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। এ বছর চাহিদা অনুযায়ী গুড় সরবরাহ করতে পারছি না।’
সদর উপজেলার গতন শহর থেকে গুড় কিনতে আসা আব্দুল মালেক বলেন, ‘এখানে খেজুরের রস থেকে তৈরি খাঁটি গুড় পাওয়া যাচ্ছে জেনে কিনতে এসেছি। বাজারে বেশির ভাগ সময় ভেজাল পাওয়া যায়। তাই বাড়িতে পিঠা বানানোর জন্য এখান থেকে চার কেজি গুঁড় কিনলাম।’
নওগাঁর ধামুরহাট থেকে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে খেজুরের রস খাওয়ার জন্য আমরা ১০ জন একসঙ্গে এসেছিলাম। রস খেয়ে অনেক ভালো লাগল। এখানে রস থেকে খাঁটি গুড় তৈরি করা হচ্ছে। তাই বাড়িতে পিঠা বানানোর জন্য দুই কেজি নিয়ে যাচ্ছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদিকুল ইসলাম বলেন, জয়পুরহাট জেলায় মোট প্রায় ২৬ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে গাছিরা রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন। চলতি মৌসুমে জেলায় ২৭৫ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখানে উৎপাদিত গুড় ঢাকা, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। আমরা চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছি, গাছে হাঁড়ি বসানোর সময় তা যেন নেট দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। যাতে রস বাদুড় বা অন্য কোনো প্রাণীর সংস্পর্শে না আসে এবং হাঁড়ির মধ্যে যেন চুনের প্রলেপ দেওয় হয়। এতে কাঁচা রস কোনো জীবাণুর মাধ্যমে সংক্রমিত হবে না। ফলে আমরা নিরাপদ রস পাব।’
সিভিল সার্জন ডা. আল মামুন বলেন, ‘বাদুড়ের সং¯পর্শের কারণে খেজুরের রস খেলে তা থেকে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি থাকে। এতে মানুষের জীবনের ঝুঁকি থাকে। স্বাস্থ্য বিভাগের মাসিক সভায় এ বিষয়ে সকলকে নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছি। সেই মোতাবেক তারা মানুষকে সচেতন করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। পাশাপাশি আমার পরামর্শ কেউ যেন কাঁচা রস না খায়। খেলেও রস কমপক্ষে এক হাজার ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১৫ মিনিট ফুটিয়ে তারপর ঠান্ডা করে খেতে হবে।’


প্রকাশিত: January 17, 2026 | সময়: 1:21 am | সুমন শেখ

আরও খবর