বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রির্পোটার: সীমান্তবর্তি ভারত থেকে দলবেধে আসা শেয়ালের আক্রমণে রাজশাহীর চরে এক রাতে দুইশ গরু-মহিষ আহত হয়েছে। এতো গরু-মহিষকে একসঙ্গে এর আগে কখনোই শেয়ালে কামড়ায়নি বলে দাবি করেছেন খামারিরা। ফলে এটি বিষ্ময়কর এবং এ নিয়ে খামারিদের মাঝে রীতিমতো আতঙ্ক নেমে এসেছে। আক্রান্ত গরু-মহষিগুলোর মধ্যে কামড় দিয়ে কয়েকটি গরুর কান ছিঁড়ি নিয়েছে শেয়ালের দল। বাকি গরু-মহিষের মুখ জখম করে দিয়েছি। ঘটনাটি ঘটেছে পদ্মার দুর্গম মাঝচর এলাকায় গত ২০ ডিসেম্বর রাতে। খবর পেয়ে পরের দিন দুপুরেই আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোকে র্যাবিজ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো আতঙ্ক কাটেনি খামারিদের। গরু বাঁচাতে এখন রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন খামারিরা। পাশাপাশি আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোকে যেন কোনোভাবেই বিক্রি করা না হয়, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র মতে, মাঝ চরের বাসিন্দারা অধিকাংশই গরু-মহিষের খামারি। একেকজনের ৫ থেকে শতাধিক গরু-মহিষও আছে। তারা কয়েকজন মিলে দলবেধে গরু-মহিষগুলো চরে চড়ান। সেগুলো চরেই রাতে পাল করে একসঙ্গে চারিদেক বাঁশ অথবা খড়ের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখে বাসায় চলে আসেন। আবার ভোরে গিয়ে সেগুলো বের করে চরের মধ্যে চড়ায় থাকেন। এভাবেই চরের খামারিরা বছরের পর বছর ধরে চরে গরু-মহিষ পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু ২১ ডিসেম্বর ভোরে কয়েকজন রাখাল চরে রেখে আসা পালের গরু-মহিষের কাছে গিয়ে বিস্মিত হোন।
তাঁরা দেখেন বেশ কয়েকটি গরু-মহিষ পালের বাইরে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। কাছে যেতেই দেখেন, কোনো কোনোটির মুখের ওপর দিয়ে, আবার কোনো কোনোটির কান দিয়ে রক্ত ঝরছে। কোনোটির আবার একটি কানই নাই। কান কেটে নেওয়া হয়েছে, সেই কান দিয়ে রক্ত ঝরছে অঝরে। আর অদূরে শতাধিক শেয়াল ছুটাছুটি করছে। তৎক্ষনাত রাখালরা চরের বাসিন্দাদের খবর দেন। তাঁরা ছুটে গিয়ে একই দৃশ্য দেখেন। এরপর চরের গরু-মহিষের মালিকরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য আবু জাফর ইবনে আলম প্রমিজকে খবর দেন।
ইউপি সদস্য আবু জাফর ইবনে আলম প্রমিজ বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি দ্রুত উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে খবর দেয়। তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোকে র্যাবিজ ভ্যাকসিন প্রয়োগের ব্যবস্থা করেন। একে একে আক্রান্ত ২০০ গরু-মহিষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ছে। শেয়ালের কামড়ে আক্রান্ত গরু-মহিষগুলোর মাঝে যেন জলাতঙ্ক রোগ ছড়াতে না পারে, সে জন্য পর্যায়ক্রমে আরও চারটি ডোজ দেওয়া হবে।’
চরের খামারি মাহাবুবুল শেখ বলেন, ‘আমার ৪০টি গরু-মহিষ আছে। আরও কয়েকজনের মিলে একসঙ্গে ৬০০ গরু-মহিষ একপালেই রাখা ছিল। কিন্তু ভোরে গিয়ে দেখি অনেকগুলো গরু-মহিষকে কামড়ায়ছে শেয়াল। পাশের আরও একটি পালেও একই অবস্থা। সবমিলিয়ে অন্তত ২০০ গরু-মহিষকে কামড়াইছে শেয়াল। এর আগে কখনো এতোগুলো গরু-মহিষকে একসঙ্গে কামড়ানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে আমাদেও মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমরা গরু-মহিষ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি।’
আরেক খামারি ঝাটু শেখ বলেন, ‘আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে গরু-মহিষ পালন করছি। কখনো মহিষকে শেয়ালে আক্রমণ করেছে এমন ঘটনা ঘটেনি। কারণ মহিষ দেখলে শেয়াল ভয় পাই। এই প্রথম মহিষকেও কামড়াইছে শেয়াল। এটি নজিরবিহীন।’
স্থানীয় কাজিম আলী নামের খামারি জানান, ‘মাঝ চরের অদুরেই রয়েছে ভারতের ষাটবিঘা চর। ওই চরে সাধারণত কেউ যায় না। দুর্গম ওই চরে বাংলাদেশী বা ভারতীয় কেউ যান। ফলে ওই চরে প্রায় হাজার কয়েক হাজার বন শুকুর আর কয়েক হাজার শেয়াল বসবাস করে। ঘটনার আগেরদিন গোদাগাড়ীর কয়েকজন আদিবাসী (সাওতাল) মাঝ চরের পাশেই ভারতের সেই ষাটবিঘা চরে গিয়েছিলেন শেয়াল ও শুকুর শিকার করতে। তারা কয়েকটি শুকুর আর শেয়ালের বাচ্চা শিকার করে নিয়ে গেছেছিলেন ওইদিন। এরপর ওইদিন রাতেই শেয়ালগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশের চরে ঢুকে গরু-মহিষের পালে আক্রমণ করে। তবে এই ধরনের ঘটনা অতিতে কখনো ঘটেনি বলেও দাবি করেন কাজিম আলী।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার মো: আব্দুল লতিফ বলেন, ‘ঘটনার কথা শুনে প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলাম। একসঙ্গে এতোগুলো গরু-মহিষকে বিশেষ করে মহিষকে তো শেয়ালে কামড়ায় না। দুই একটা গরুকে কামড়াতে পারে। পর্যায়ক্রমে হয়তো এক-দুইশ গরুকে কামড়াতে পারে। কিন্তু এক রাতে এতোগুলো গরু-মহিষকে কামড়ানোর কথা শুনে হতবাক হয়েছিলাম। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তার সত্যতা দেখে দ্রুত র্যাবিজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। ভ্যাকসিন দেয়ার সময় দুজন চরবাসীকেও শেয়াল কামড় দিতে দেখা যায় দিনে-দুপুরে। তাতে বুঝা যায় আক্রমণকারী শেয়ালগুলো ক্ষুব্ধ ছিলো। শতাধিক শেয়াল গরু-মহিষের পালের অদূরেই অবস্থান করছিল। এটি বিষ্ময়কর।’
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে তিনটি কারণে এতোগগুলো গরু-মহিষকে এক রাতেই আক্রমণ করার লক্ষণ খুঁজে পেয়েছি। এই কারণগুলো, শেয়ালের কয়েকটি বাচ্চা শিকার করা, খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট হওয়া অথবা দুই-চারটি শেয়াল পাগলা হয়ে যাওয়া। যাদের সঙ্গে অন্যান্য শেয়ালও এসে গরু-মহিষগুলোকে আক্রমণ করেছে। তবে দলবেধে আক্রমণ করার কারণে মহিষও তাদের হাত থেকে রক্ষা পাইনি।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আক্রান্ত গরু-মহিষগুলো যেন এখনোই কেউ বিক্রি করতে না পাওে, সেজন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এলাকায় নরজদারি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চরের খামারিরাও সাধারণত এই সময়ে গরু-মহিষ বিক্রি করেন না। আগামি কোরবানিতে বিক্রি করবেন। এছাড়াও আমরা দ্রুত ভ্যাকিসিনের ব্যবস্থা করেছি। বাকি চার ডোজও নিয়মমতো দেওয়া হবে। ফলে এই ভাইরাস মানবদেহে ছড়ানোর কোনো আশঙ্কা নাই।’