, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ও ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির দাবিতে রাজশাহী জুড়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। এছাড়াও নগর ছাত্র শিবির, রাবি ও রাজশাহী কলেজ ছাত্র দলের উদ্যোগে মানবন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় দিনের মতো ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। শিক্ষার্থীরা পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ সোমবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। তাঁরা কর্মসূচি থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ধর্ষণের বিচারকার্য সম্পন্ন করে রায় কার্যকরের দাবি জানান। সেই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনেরও দাবি জানান।
বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা এর আগে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাসের প্যারিস রোডে জড়ো হতে থাকেন। সেখানে অবস্থান নিয়ে তাঁরা ধর্ষণবিরোধী নানা স্লোগান দেন। পরে শিক্ষার্থীরা একটি মিছিল নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের তালাইমারী এলাকা থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একটি মিছিল এসে এতে সংহতি জানায়।
এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, নো মোর র্যাপিস্ট’, ‘আমার বোনের কান্না, আর না আর না’, ‘ধর্ষকের শাস্তি, মৃত্যু মৃত্যু’, ‘ধর্ষকের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’, ‘খুনি কেন বাইরে, ইন্টেরিম জবাব চাই’, ‘বিচার বিচার চাই, ধর্ষকের বিচার চাই’, ‘রশি লাগলে রশি নে, ধর্ষকদের ফাঁসি দে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
কর্মসূচিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাবি সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমাদের দাবি একটাই, যত দ্রুত সম্ভব বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। যতগুলো ধর্ষণ-কাণ্ড হয়েছে, সব ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ধর্ষণের বিচারে আমরা আর কোনো টালবাহানা দেখতে চাই না। ১৮০ বা ৯০ দিনের শুভংকরের ফাঁকি নয়, ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করতে হবে। এই মর্মে আইন পাস করতে হবে।’
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী হিরামনি বলেন, ‘সারা দেশের সবগুলো ধর্ষণের বিচার করতে হবে। আমরা তিন মাস, ছয় মাস বুঝি না, যত দ্রুত সম্ভব ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
শিক্ষার্থীরা এর আগে গত শনিবার রাতে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড ও জোহা চত্বরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এ ছাড়া তাঁরা গতকাল রোববার ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
ইসলামী ছাত্রশিবির: ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের দাবিতে রাজশাহী মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১০ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজশাহীর জিরো পয়েন্ট মোড়ে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি শামীম উদ্দিন, সেক্রেটারি ইমরান নাজির, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ জসিমউদ্দিন সরকার এবং রাজশাহী কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোঃ মাহমুদুল হাসান মাসুম সহ অনেকে। এসময় বিপুল সংখ্যক ছাত্র ও সাধারণ জনগণ ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ জসিমউদ্দিন সরকার। তিনি বলেন,যারা ধর্ষক, তাদের মা-বোন নেই, তাদের নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই, ধর্ষকই তাদের একমাত্র পরিচয়। ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে এবং তা প্রকাশ্যে দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন ঘৃণ্য অপরাধ করার সাহস না পায়।
এছাড়া, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির রাজশাহী মহানগর সভাপতি শামীম উদ্দিন বলেন, আমরা লজ্জিত, মাত্র আট বছরের শিশু পর্যন্ত এই নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে ২৬,৬৯৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একটি মুসলিমপ্রধান দেশে এমন নারকীয় অপরাধ কখনোই কাম্য নয়। অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হলে, কেউ আর ধর্ষণের কথা কল্পনাও করবে না।
তিনি আরও বলেন, যদি ধর্ষিতার জানাজার আগে ধর্ষকের জানাজা সম্পন্ন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেউ এই জঘন্য অপরাধের সাহস পাবে না। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নারীরা গভীর রাতেও নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, তাদের মনে কোনো ভয় থাকবে না। শুধু একটি ঘটনার বিচার নয়, অতীতের সব ধর্ষণের ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ধর্ষণের শাস্তি যেন দ্রুত কার্যকর হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই পার না পায়। পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতি সম্মান ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তারা।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে জাতীয়ভাবে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার এখনই সময়। শুধু সংগঠনের পক্ষ থেকে নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। ঘণ্টাব্যাপী চলা এই মানববন্ধন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবির রাজশাহী মহানগর ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে এবং সমাজকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
রাজশাহী কলেজ ছাত্রদল: দেশব্যাপী নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নিপিড়ন, ধর্ষণ, অনলাইন হেনস্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক অবনতি ও বিচারহীনতার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রদল।
সোমবার (১০ মার্চ) সকালে রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ (আবির) এর নেতৃত্বে রাজশাহী কলেজের মূল ফটকের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আমানুল্লাহ আমান দেশব্যাপী চলমান পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ৫ই আগষ্টের পর কখনো কল্পনা করতে পারেনি জুলাই শহিদদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে আছিয়া মতো শিশু ধর্ষণের শিকার হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ৫ই আগষ্টের চেতনাকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে পারছে না।
তিনি বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে জুলাই অভ্যুত্থানের পরেও রাষ্ট্র কি অতীতের পঁচে-গলে যাওয়া সিস্টেমেই থাকবে নাকি দেশের মানুষ যে কারণে যে কারণে রক্ত দিয়েছে সেই প্রত্যাশা পূরণ করবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার যদি দেশের অবস্থা স্বাভাবিক করতে না পারে, তাহলে দেশের মানুষ স্বৈরাচারী হাসিনার বিরুদ্ধে যেভাবে রাস্তায় নেমেছিলো আপনাদের বিরুদ্ধে নামতেও সময় লাগবে না।
এছাড়াও মানববন্ধনে উপস্থিত অন্য বক্তারা দেশব্যাপী চলমান পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানান। বর্তমানে নারীদের উপর যেভাবে নিপিড়ন বৃদ্ধি পেয়েছে তা প্রতিরোধে আইনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির দাবি জানান। ধর্ষণকের শাস্তি একমাত্র ফাঁসি নিশ্চিতের দাবি জানান। মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন, রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোঃ আমিনুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক রাশিকুজ্জামান প্রিতমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দরা।