সর্বশেষ সংবাদ :

গণশৌচাগার সংকটে রাজশাহী

শাহ্জাদা মিলন
রাজশাহীতে অন্তত কয়েক লক্ষ মানুষ বসবাস করছে। এছাড়াও বিভাগীয় শহর হওয়ায় বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার লোকের পদচারনায় মুখর থাকে শিক্ষানগরী। কয়েক বছরে বসবাসকারীদের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক বেশি। নির্মল পরিবেশ, পরিস্কার নগরী, রাজনৈতিক কোন্দল না থাকায় সকলের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে বর্তমানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকা। ফলে নামকরা ডেভেলপার্সরা এগিয়ে এসেছেন তাদের ব্যবসা নিয়ে । নতুন নতুন বহুতল ভবনে ছেয়ে যাচ্ছে পুরো শহর। উন্নতমানের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলার পরিবার থেকেও শিক্ষার্থীদের থাকার অনুমতি মিলছে সহজে।

তবে সকল সুযোগ সুবিধা মিললেও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই রাজশাহী শহরে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, রাসিকের আওতাধীন কাশিয়াডাঙ্গা মোড়,তেরোখাদীয়া কাচা বাজারের দ্বিতীয় তলায়,মেডিকেল ইমারজেন্সি গেটের বামে,সাহেব বাজার মুরগী পট্টিতে,১২ নং ওয়ার্ড ফুদকিপাড়ায়,পিএন বালিকা বিদ্যালয়ের পশ্চিম কর্ণারে,নিউমার্কেট মসজিদের পার্শ্বে,২৬ নং ওয়ার্ড মেহেরচন্ডীতে,তালাইমারী রুয়েট প্রাচীর সংলগ্ন,নওদাপাড়া আমচত্ত¡রে স্থায়ীভাবে ইজারা এবং নগরীর প্রাণ কেন্দ্র ব্যাবসায়িক এলাকা সাহেববাজারের পার্শ্বে ভুবন মোহন পার্কের ভিতরে রাসিকের অস্থায়ীভাবে ইজারা দেয়া রয়েছে গণশৌচাগারগুলো। এছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে রেল স্টেশনের পশ্চিমপার্শ্বে, ভদ্রা বাস স্টান্ডের পূর্বে,শিরোইল বাস স্টান্ড ও ঢাকা বাস স্টান্ডের ভিতরে সহ বিভিন্ন বাজারে গড়ে তোলা হয়েছে গণশৌচাগার।

পুরুষের জন্য প্রাকৃতিক কাজ সমাধান হলেও নারীদের জন্য সব জায়গায় পাশাপাশি থাকলেও আলাদাভাবে গণশৌচাগার না থাকায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে শহরের ছাত্রী কর্মজীবি,মার্কেটে আসা নারীরা। আবার গণশৌচাগারগুলোতে ধূমপায়ীরা ধূমপান করায় গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয় অধূমপায়ীদের। নারীদের ক্ষেত্রে সেটি আরো অস্বস্তি¡র ফলে গণশৌচাগারে যাবার বদলে বাড়িতে চলে যাওয়ায় তাদের কাছে ভালো মনে হয়েছে বলে কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি খরচ হচ্ছে বলে জানান তারা।

রাজশাহীর রেলগেট কামারুজ্জামান চত্ত্বরের পাশেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ, মোহনপুর, বাস যাত্রিরা পাবলিক টয়লেটের অভাবে রেল অফিসের দেয়ালে ও রেল লাইনের পাশে প্রায় পুরুষদের প্রসাব করতে দেখা যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনে মাস্টার্স সম্পন্ন করা এক পর্দাশীল নারী (মনা) তার দুই শিশুপুত্র সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন রাজশাহী মেডিকেলে শাশুড়িকে দেখার জন্য।

তিনি জানান, কাটাখালী থেকে রাজশাহী মেডিকেলের উদ্দেশ্য বের হয়েছিলেন। তালাইমারী পার হবার পর প্রসাবের বেগ আসলে তিনি রাজশাহীর রেলগেটে অটোরিক্সায় নেমে গণশৌচাগার না পাওয়ায় আবার রওনা দেন রাজশাহী মেডিকেলে। ঢোকার পরেই ইমারজেন্সি গেটের কাছে নারীদের জন্য আলাদা গণশৌচাগারের ব্যবস্থা থাকায় তিনি নারীদের টয়লেটে গিয়ে প্রাকৃতিক কাজ সম্পন্ন করেন।

তিনি জানান,আমি রক্ষণশীল পরিবারের স্ত্রী ও মা। ফলে আমার মতো আরো অনেকেই নিশ্চয় এমন সমস্যা পড়ছে প্রতিদিন। জরুরী ভিত্তিতে আধুনিকমানের আলাদাভাবে কয়েকটি স্থানে নারীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা রেখে গণশৌচাগার নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের সাথেই মনিচত্ত্বরে একটি উন্নতমানের গণশৌচাগার ছিলো তবে সড়ক সম্প্রসারণের কারণে সেটি ভেঙ্গে ফেলায় শতশত শিক্ষার্থীসহ বাজারে আসা ক্রেতারা বিড়ম্বনায় পড়ছেন সবসময়। প্রধান সড়কের সাথে চোখে পড়ে এমন জায়গায় গণশৌচাগার নেই।

রাজশাহী বিএমডিএ’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহফুজুল হক বলেন, আধুনিকমানের পাবলিক টয়লেট একটি শহরের ভাবমূর্তি উজ্জল করে। তাই শহরে আরো কয়েকটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ হলে নগরবাসীর জন্য ভালো হবে।

তিনি আরো জানান, পাবলিক টয়লেট যত বেশি থাকবে এতে শারীরিক ও মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পাবে সকলে। পাবলিক টয়লেট থাকবে সবসময় পরিস্কার। প্রতিদিন শতশত মানুষ এটি ব্যবহার করে। জীবানুমুক্ত রাখতে অন্তত দুই বেলা পরিস্কার করা উচিত ফ্লোরগুলো। যেহুতু রাজশাহী নতুনরুপে সাজানো হচ্ছে সড়ক বড় করে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে অনুরোধ থাকবে আধুনিক ও মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়। যেনো তারা সেখানে যেতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।

রাসিকের নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান,ইজারা দেয়া পাবলিক টয়লেট থেকে বছরে গড়ে দশ থেকে বারো লক্ষ টাকা আয় হয় সিটি কর্পোরেশনের। আমরা কথা বলেছি আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণের বিষয়ে। খুব শীঘ্রই একটা ফলাফল জানাতে পারবো।
অনেক শহুরে শিক্ষার্থী ও নারীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে টয়লেট চেপে রাখা এবং পথে যাতে টয়লেট না চাপে সেজন্য কিছু না খাওয়া বিশেষ করে পানি পান না করার প্রবণতা দেখা যায়। দীর্ঘ সময় পায়খানা ও প্রসাব চেপে রাখার ফলে নারীরা নানা রকম শারীরিক জটিলতার মধ্যে পড়েন।

বিষেশজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, কেবল নারীরা নন, এজন্য পুরুষেরাও ভুগতে পারেন মূত্রনালিতে সংক্রমণসহ নানা ধরণের জটিলতায়। এর ফলে সবচেয়ে বেশি হয়, ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন বা ইউটিআই, যাকে বলা হয় মূত্রনালির সংক্রমণ। এটা হয়ই বেশিক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখলে ব্লাডারে যে জীবাণু জন্মায় তা থেকে। এটা পরবর্তীতে অন্য সমস্যা তৈরি করে। যেমন বারবার যদি কারো ইউটিআই হয়, তাহলে তার নারীর প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

প্রস্রাবে ইউরিয়া এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো টক্সিন জাতীয় পদার্থ থাকে। ফলে বেশিক্ষণ চেপে রাখার ফলে বিষাক্ত পদার্থ কিডনিতে পৌঁছে কিডনিতে স্টোন বা পাথর তৈরি করতে পারে।

‘এছাড়া প্রস্রাব চেপে রাখার কারণে ব্লাডার ফুলে যেতে পারে। সেই সঙ্গে কারো যদি আগে থেকে কিডনিতে কোন সমস্যা থাকে এবং সে নিয়মিত প্রস্রাব চেপে রাখে তাহলে ক্রমে তার কিডনি কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করবে।’

এজন্য রক্তের বিভিন্ন সংক্রমণসহ নানা ধরণের সংক্রমণ হতে পারে। কেবলমাত্র টয়লেট চেপে রাখার কারণে শ্বাসকষ্ট এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণও হতে পারে। এছাড়া প্রস্রাব করার সময়ে প্রচন্ড ব্যথাও অনুভব করতে পারেন একজন মানুষ।

শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট ও নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকলে নগরবাসী আরো নিরাপদ ও মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পাবে। এতে আরো সুনাম বাড়বে রাসিকের। একই সাথে আরো কয়েকটি আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা গেলে বছরে বড় অংশের আয় বাড়ার সুযোগও থাকছে সিটি কর্পোরেশনের। একদিকে কিছু কর্মসংস্থান হবে অন্যদিকে মিলবে শারীরিক জটিলতা থেকে মুক্তি।

সানশাইন / শামি

 


প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৬, ২০২২ | সময়: ৫:৩৮ অপরাহ্ণ | সুমন শেখ