, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতের পুনর্গঠন ও চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে বর্তমান সরকার সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মসূচি ও বাজেট বৃদ্ধি করেছে। জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজশাহীর একটি হোটেলে ইউনিসেফের সহযোগিতায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর আয়োজিত ‘সমন্বিত ইপিআই, এইচপিভি ভ্যাকসিনেশন, ই ট্রাকার এবং সামগ্রিকভাবে রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মসূচির বিভাগীয় পর্যালোচনা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগের ফলে এ কর্মসূচির আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, সিভিল সার্জন, ইউএইচএফপিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ইপিআই ও এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখতে হবে। টিকাদানে শিথিলতা সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়াতে পারে। শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে সেবার মান বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সাভারে একটি আধুনিক হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য প্রশাসকদের বাজেট ব্যবস্থাপনা, ই-জিপি, মানবসম্পদ পরিচালনা ও ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বদলি ও পদায়ন ব্যব¯’াকে আরও কার্যকর করতে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, ই-হেলথ অটোমেশন চালুর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে নির্ভুল জন্মনিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বা¯’্যসেবার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে টিকাদান কর্মসূচি ও স্বা¯’্যতথ্য সংগ্রহে তাদের তথ্য সংরক্ষণের ব্যব¯’া করা হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত রোগ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়াতে উপজেলা স্বা¯’্য কমপ্লেক্সগুলোতে আধুনিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এনসিডি কর্নার শক্তিশালী করার কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে জনবলসংকট নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজশাহী বিভাগের যে-সব জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বাধা নিরসন করে শূন্যপদ পূরণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসক পদায়নে আঞ্চলিক সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি চিকিৎসকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রোগীদের সেবা দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনই স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে গণমাধ্যমকর্মীদের গঠনমূলক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন, রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার রেজাউল আলম সরকার, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম এবং ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার ডা. রিয়াদ মাহমুদ।
কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. হাবিবুর রহমান। পরে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্য কর্মসূচির অগ্রগতি, অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। কর্মশালায় মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে, সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জনগণের জন্য আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
এদিকে, রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) পরিচালিত সিটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। শনিবার বিকেলে রাজশাহী মহানগরীর রানীনগরস্থ সিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন তিনি। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে হাসপাতালটি ঘুরে দেখান। পরিদর্শনের শুরুতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী সিটি হাসপাতালের বহির্বিভাগ, বিভিন্ন ল্যাব, ওয়ার্ড ও ক্যাবিন, অপারেশন থিয়েটারসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং সার্বিক কার্যক্রম ও চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী সিটি হাসপাতালকে অত্যাধুনিক হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, রাসিক প্রশাসক মহোদয় আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। হাসপাতালটি আয়তনে বড় হলেও এর ভবন অনেক পুরোনো। বিগত দিনে অযত্ন ও অবহেলার কারণে এখানে ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরো বলেন, প্রশাসক মোঃ মাহফুজুর রহমান রিটন এ অঞ্চলের একজন জনপ্রিয় নেতা। তিনি ইতোমধ্যে মানুষের প্রতি তাঁর দরদ ও ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছেন। এই হাসপাতালকে ঘিরে তাঁর অনেক স্বপ্ন ও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর পরিকল্পনাগুলো আমার কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। রাসিক প্রশাসকের নেতৃত্বে এখানে একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব হলে তা রাজশাহীবাসীর জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ হাসপাতালের উন্নয়নে যতটুকু সম্ভব, আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনেও সহযোগিতা করা হবে। আমি এই হাসপাতালটিকে রাজশাহীর অন্যতম প্রধান হাসপাতালে পরিণত করার সম্ভাবনা দেখছি।
এ সময় রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া সিটি হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। বিএনপি সরকারের অবদান থাকায় বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এ হাসপাতালের কোন উন্নয়ন হয়নি। সিটি হাসপাতালকে অত্যাধুনিক হাসপাতালে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করবো। আজকে আমি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনি আমাকে সিটি হাসপাতালের আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেছেন।
রাসিক প্রশাসক আরো বলেন, রাজশাহী নগরীকে আরো পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, বাসযোগ্য, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ কাজে আমি নগরবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
পরিদর্শনকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ উল ইসলাম, রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, সচিব সোহেল রানা, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফএএম আঞ্জুমান আরা বেগম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আহমদ আল মঈন পরাগ, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মোঃ মামুন, বাজেট কাম হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন আরজু এবং সিটি হাসপাতালের ইনচার্জ ও আবাসিক চিকিৎসক ডা. তরিকুল ইসলাম বনি সহ অন্যান্য চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় বোয়ালিয়া থানা (পূর্ব) বিএনপির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম নিপু, সাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলম রিংকু, মহানগর বিএনপির দপ্তর সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মুঈদুর রহমান মঈদ, ২৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আফরোজ, ২৪নং ওয়ার্ড বিএনপির লিটন, সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম রজু সহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।