, , ।
সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীতে ৮ অক্টোবর থেকে রুপালি ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম চলছে। শুরু হয়েছে ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান। এ সময় নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় সংসার চালানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পদ্মা পাড়ের জেলেরা।
এ সময়ে সাগরের নোনা পানি থেকে নদীর মিঠা পানিতে এসে ডিম ছাড়ে মা ইলিশ। ডিম ছেড়ে আবার সাগরেই ফিরে যায়। এই প্রজনন চক্র যাতে বাধা গ্রস্ত না হয়, সেজন্য নদীতে মাছ ধরায় চলছে নিষেধাজ্ঞা। এ কারণে নদীর পাড়ে মৎস্য ঘাটগুলোতেও নোঙর করা সারি সারি নৌকা আর জালের ¯ুÍপ। ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞা মেনে জেলেদের এই বিরতি।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে প্রায় ২০ কিলোমিটার পদ্মা নদী এলাকাকে ইলিশের অভয়শ্রম হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছে। এ সময় পদ্মা নদীতে মাছ ধরা, ইলিশ সংরক্ষণ, আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও মজুদকরণ নিষিদ্ধ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পর থেকেই নদীতে টহল ও নজরদারি বাড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে পুরো পদ্মা নদী এখন জেলে শূন্য। অলস সময় কাটাচ্ছেন জেলেরা। নদীর পাড়ে জাল ও নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা।
জেলেদের অভিযোগ সারাবছর কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়া এবং ঋণের বোঝার মধ্যে এই ২২ দিন কাজ বন্ধ থাকায় অনেক জেলে পরিবার তীব্র আর্থিক সংকট ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। জেলেরা চালের পরিমাণ বাড়ানো এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন। জেলেরা জানান, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকার যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সেটা মেনে জেলেরা নদীতে নামছে না।
জেলেদের অভিযোগ তাদের পুনর্বাসন করার কথা থাকলেও সেটা এখন পর্যন্ত হয়নি। যে পরিমান জেলে রয়েছে, সে পরিমান সরকারি খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়না বলে অভিযোগ করেন জেলেরা। নিষেধজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য বরাদ্ধকৃত চাল সঠিক তালিকা তৈরি করে দ্রুত যেন তা পেতে পারে সেটা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মা ইলিশ রক্ষা অভিযান পুরোপুরি সফল করতে প্রকৃত জেলেদের তালিকা নির্ভুলভাবে হালনাগাদ করা, পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। এতে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের নদীতে নামার প্রবণতা কমে আসবে।
সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে ২৫ কেজি করে চাল দিচ্ছে। তবে জেলেদের দাবি পরিবার প্রতি এই চাল অপ্রতুল এবং সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে অন্তত ১০০ কেজি চাল ও বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।
জেলেদের প্রধান অভিযোগ ‘জেলে কার্ড’ বণ্টন নিয়ে। আনারুল ইসলাম, রাজকুমার, বিণয় চন্দ্র এর মতো অনেক প্রকৃত জেলে বছরের পর বছর মাছ ধরলেও তাদের কোনো কার্ড হয়নি। অন্যদিকে মাছ না ধরেও অনেকে জেলে কার্ড ও সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বারইপাড়া জেলে পলীøর বাসিন্দা লক্ষন বলেন, নদীতে মাছ ধরা বন্ধ বেকার বসে আছি। তবে মা ইলিশ বাঁচানো ছাড়া উপায় নেই। কষ্ট হলেও আইন মানতে হবে। কিন্তু সহায়তা ছাড়া টিকে থাকা দুঃসাধ্য।’
দেওয়ানপাড়া গ্রামের জেলে কামাল উদ্দীন জানান, সরকারের দেওয়া ২৫ কেজি চাল দিয়ে বড় পরিবার চালানো কঠিন। পর্যাপ্ত সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকলে পেটের দায়ে অনেককে বাধ্য হয়ে লুকিয়ে নদীতে নামতে হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
রেলওয়ে বাজার জেলে পল্লীর রাজকুমার বলেন, মাছ ধরা বন্ধ, তাই জাল-নৌকা তীরে বেধে রেখেছি। সরকার যে চাল দেবে তা যেন দ্রুত বিতরণ করা হয়।
গোদাগাড়ী সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অহেদুজ্জামান জানান, জেলেদের জন্য বরাদ্দ চাল এক সপ্তাহের মধ্যেই বিতরণ করা হবে। গোদাগাড়ীতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২ হাজার ৭’শ ৯৪ জন হলেও নদীর তীরবর্তী জেলে পরিবারকে সরকারিভাবে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ১ হাজার ৯০০ জেলেকে ২৫ কেজি করে সাড়ে ৪৭ মেট্রিক টন চাল চাল দেওয়া হবে। অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে প্রায় ৫’শ। ফলে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রায় ১ হাজার ৩৯৪ জন জেলে চাল থেকে বঞ্চিত হবেন।
তিনি আরও বলেন, এসময় ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতে ৭ অক্টোবর মধ্য রাত থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। অভিযান সফল করতে পুলিশ, নৌপুলিশ ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে মাঠে থাকবে।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান বলেন, নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়জুড়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ইলিশ সংরক্ষণে এ অবরোধ অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। এটি আমাদের গর্ব; আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবিকার প্রতীক।