, , ।
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
কলকাতার ঐতিহাসিক আলিপুর জেল মিউজিয়ামের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই যেকোনো দর্শনার্থীর হৃদয়ে ভেসে আসে এক অলৌকিক সুরের ঝংকার। বাম পাশ থেকে ভেসে আসা সেই সুর ও কথা বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মহাকাব্যিক রূপকল্পের এক অবিনাশী দলিলÑ“কারার ঐ লৌহ-কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট / রক্ত-জমাট শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!” এই সুর এক নিমিষেই মানুষকে দেহ-মনে আন্দোলিত, উদ্বেলিত ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দামাল বিপ্লবী করে তোলে। এটি কেবল কোনো গীতি-কবিতা নয়; এটি দাসত্বের শৃঙ্খল চূর্ণ করার এক সার্বজনীন মহাগর্জন। শুনলেই মনে হয়, চোখের সামনে ভেসে উঠছে রক্তে রাঙানো কোনো ইতিহাসের ক্যানভাস, কানে বাজছে বিপ্লবীদের শিকল ভাঙার ঝনঝনানি আর কোনো এক মহা-বিপ্লবের তাণ্ডব নৃত্য-ডামাডোল।
আলিপুর জেলের ‘নজরুল সেল’ যেন এক জীবন্ত শোক ও দ্রোহের চিত্রকল্প। জেল মিউজিয়ামের বিষণ্ন নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ৯ নম্বর সেলটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে যেন এক শতাব্দীর ইতিহাস একমুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায়। লাল লোনাধরা ইটের তৈরি গম্বুজ আকৃতির নির্জন এক কক্ষ, যার ভারী লোহার শলাকাওয়ালা কপাট আজও ঔপনিবেশিক শোষণের যাতাকলকে ধরে রেখেছে। ঘামে, চোখের জলে আর ধমনীর রক্তে ভেজা চার দেয়ালের আবছা আলো-ছায়ায় ফুটে ওঠে এক চির-বিদ্রোহী তরুণ কবির অবয়ব। কক্ষের মেঝেজুড়ে বিছানো সামান্য জীর্ণ চাটাই, এক কোণে রাখা পুরোনো পিতলের থালা আর মাটির জলের ঘড়াÑযার পাশেই যেন অলৌকিকভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কবির ‘ধূমকেতু’র অগ্নিঝরা পাতা। ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী অশ্বত্থের ছায়া লোহার গ্রিল ভেদ করে যখন বিষণ্ন মেঝেতে পড়ে, তখন মনে হয় কবি যেন আজও সেই নিভৃত আঁধারে বসে শিকল-পরা দু’হাত দিয়েই জেলের দেওয়াল পিটিয়ে সুরের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে যাচ্ছেন। সেলের সামনে স্থাপিত কবির ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তিটির দিকে তাকালে মনে হয়, এক দামাল পুরুষ আজও রক্তচক্ষু উঁচিয়ে স্বৈরাচারের সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন। স্পিকার থেকে ভেসে আসা সুরের গর্জন আর এই থমথমে পরিবেশ মিলে দর্শনার্থীর ধমনীতে রক্তের গতি বাড়িয়ে দেয়; অনুভবে স্পষ্ট হয়Ñএটি কোনো মৃত প্রত্নতাত্ত্বিক ঘর নয়, বরং এক অবিনাশী আগ্নেয়গিরির জীবন্ত জ্বালামুখ।
গানটি রচনার প্রেক্ষাপট খুবই চমকপ্রদ। এমন কি নজরুলের জীবনের মতোই আকস্মিকতাময়, রোমাঞ্চকর ও নাটকীয়। মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে তরুণ সুভাষচন্দ্র বসুসহ একের পর এক ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামীরা কারারুদ্ধ হচ্ছিলেন। ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বরে ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসও কারারুদ্ধ হন। দেশবন্ধুর গ্রেপ্তারে সারা বাংলায় তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব দ্রোহ আর ক্ষোভ। ঠিক সেই আবেগঘন মুহূর্তে বাসন্তী দেবীর সস্নেহ অনুরোধে এবং কারাগারে ব›দি বিপ্লবীদের ঝিমিয়ে পড়া মনোবলে অগ্নিস্ফূলিঙ্গ ছড়াতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন এই অগ্নিঝরা গান।
কবিবন্ধু মুজাফ্ফর আহ্মদ বলেন “১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর চিত্তরঞ্জন গিরেফ্তার হয়ে জেলে গেলেন। তারপর তাঁর স্ত্রী শ্রীযুক্তা বাসন্তী দেবী সম্পাদিকা হলেন। এই সময়ে তিনি একদিন দাস পরিবারের তাঁর দেবর সম্পর্কিত শ্রীসুকুমাররঞ্জন দাসকে “বাংলার কথা”য় ছাপানোর উদ্দেশ্যে একটি কবিতার জন্য নজরুল ইসলামের নিকটে পাঠালেন। …… শ্রীসুকুমাররঞ্জন কবিতার জন্যে ৩/৪-সি, তালতলা লেনে আমার বাসায় এসেছিলেন ……। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নজরুল তখনই কবিতা লেখা শুরু করে দিল। সুকুমাররঞ্জন ও আমি আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে কবিতাটি লেখা শেষ করে নজরুল তা আমাদের পড়ে শোনাল। সুকুমাররঞ্জন খুবই খুশি হলেন। এই কবিতাটি ছিল নজরুল ইসলামের “ভাঙ্গার গান।”
গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারিতে ‘বাঙলার কথা’ পত্রিকায় এবং পরবর্তীতে ১৯২৪ সালের আগস্টে কবির বিখ্যাত ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রকাশক ছিল কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি এবং যুগবাণীর আর্য পাবলিশিং হাউস। উৎসর্গ করা হয়েছিল মেদিনীপুরবাসীদের উদ্দেশ্যে। “অগ্নিঝরা সুর ও বারুদগর্ভ বাণীর রচিত শৃঙ্খলা ভাঙ্গার এই গানটি তুলনা গানের ইতিহাসে নেই, কবিতার জগতেও নেই।” গানটি সম্পর্কে ড. করুণাময় গোস্বামী যথার্থই বলেছেন “এমন বজ্রনাদী সংগীতবাণী বাংলা কাব্যসংগীতের ধারায় আর ধ্বনিত হতে শোনা যায়নি। শব্দপ্রয়োগ ও ছন্দ কৌশলের ভেতর দিয়ে এমন বেগ, এমন বীর্যবত্তাকে উচ্ছসিত করে তুলতে নজরুল ছাড়া আর কেউ পারেন নি।” সাহিত্য সমালোচক গোপাল হালদারের মন্তব্য “এটি হচ্ছে জাতীয় আন্দোলনের প্রথম মহান সংগীত। পূর্ব রচিত স্বদেশী গানের চেয়ে অনেক বেশী উচ্চনাদী।” সত্যিকার অর্থেই রাজবন্দীদের মনে ব্রিটিশ শাসনের ভয় গুঁড়িয়ে দিয়ে গানটি মুহূর্তে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এর তেজ ও গণপ্রভাব এতই ভয়াবহ ছিল যে, ১৯২৪ সালের ১১ নভেম্বর তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার গানটি ধারণকারী ‘ভাঙার গান’ গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের বহুল প্রচলিত, জনপ্রিয় ও গোলার মত বিধ্বংসী রূপ জাগানিয়া একটি গান ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’। গানটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অসাম্প্রদায়িক রূপক ও পৌরাণিক চিহ্নের বিস্ময়কর সংমিশ্রণ। কবি নজরুল এতে প্রাচ্যের মহাকাব্যিক ঐতিহ্যকে বিপ্লবের নতুন ভাষায় রূপ দিয়েছেন। কবি দেবাদিদেব মহাদেব বা শিবের ধ্বংসাত্মক রূপ ‘প্রলয়ঙ্কর’কে আহ্বান জানিয়েছেন। জীর্ণ, অত্যাচারী শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে তিনি শিবের ‘প্রলয়-বিষাণ’ (ধ্বংসের শিঙ্গা) বাজানোর ডাক দেন। মহাদেবের ‘ত্রিনয়ন’ বা তৃতীয় নেত্র যেভাবে সমস্ত পাপ ও কামকে ভস্ম করে দেয়, কবি চান তরুণদের সেই অগ্নিরূপে আবির্ভূত হয়ে অন্যায়ের পাষাণ-বেদী ভস্ম করে দিতে।
গানটিতে মুসলিম পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অনবদ্য প্রকাশ ঘটেছে “মার হাঁক হায়দরী হাঁক কাঁধে নে দুন্দুভি ঢাক ডাক ওরে ডাক মৃত্যুকে ডাক জীবন-পানে” পংক্তিটিতে। ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে বীর্যবান তেজস্বী রূপকটি নজরুল ফুটিয়ে তুলেছেন এই চরণে। ‘হায়দর’ হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জামাতা ও ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর বীরত্বসূচক উপাধি, যার অর্থ ‘সিংহ’। খায়বারের ঐতিহাসিক যুদ্ধে হযরত আলী (রা.) তাঁর অসামান্য বীরত্ব ও লৌহকপাট সমতুল্য দুর্গ একাই চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেই ‘হায়দরী হাঁক’ বা সিংহের মতো মহাগর্জনের রূপক এনে বাঙালি যুবসমাজকে সকল বাধা-শৃঙ্খল চূর্ণ করার ডাক দিয়েছেন।
‘মার্চিং টোন’ বা কুচকাওয়াজের তালে রচিত এই গানে কবি ‘বীররস’ ও ‘রৌদ্ররস’-এর এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। “রক্ত-জমাট”, “পাষাণ-বেদী”, “ওরে ও তরুণ ঈশান”, “ওরে ও পাগলা ভোলা”, “প্রলয় দোলা”, “হেঁচকা টানে”Ñএই শব্দবন্ধগুলো স্বরবৃত্ত ছন্দের দোলায় যখন আছড়ে পড়ে, তখন তা এক সম্মোহনী ও অগ্নিঝরা সুরতরঙ্গ তৈরি করে। প্রলয়, বিদ্রোহ ও ভাঙনের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। কবি বন্দি বিপ্লবীদের ভীমকারার লৌহা কপাট ভেঙে ফেলতে আহ্বান করেছেন এই অগ্নিঝরা সুরে। রক্ত জমাট পাষাণবেদীতে শিবের সংহারক রূপে এসে সমস্ত শিকল ছিন্ন করে দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছেন তরুণদের। কবি স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজের সমস্ত ভেদাভেদের সীমারেখা আর অচলায়তন ভেঙে ফেলতে, তাই ডাক দিয়েছেন ভাঙার। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, মুক্তির আকাক্সক্ষা মানুষের জন্মগত অধিকার। সেই স্বাধীনতার আন্দোলনকারীকে কেউ দণ্ডিত করতে পারে না। ফাঁসির সাজা দিয়েও কোনো বিপ্লব দমিয়ে রাখা যায় না। কবি ‘পাগলা ভোলা’ অর্থাৎ শিবকে আহ্বান করেছেন যেন তিনি প্রলয়ের হেচকা টানে গারদের আগল ভেঙে দেন। জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে বন্দি বিপ্লবীরা যেন সমস্ত কারাগারের তালা লাথি মেরে ভেঙে ফেলেন। এবার আগুন জ্বলে উঠুক সমস্ত বন্দিশালায়, উপড়ে যাক অত্যাচারীর প্রোথিত সবকিছু, পরাধীনতার শৃংখল ভেঙ্গে গিয়ে সূচিত হবে স্বাধীনতার নতুন ভোর।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই গানটি কেবল গান হয়ে থাকেনি, বরং মুক্তিকামী সাত কোটি জনতার হৃদয়ে গানটি রূপ নিয়েছিল একেকটি তাজা গোলাবারুদে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, ঘরবাড়িতে আগুন আর লাখো মা-বোনের আত্মত্যাগের সেই চরম অন্ধকার দিনে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে যখন বজ্রকণ্ঠে বেজে উঠতÑ“লাথি মার ভাঙ রে তালা / যত সব বন্দী-শালায়-আগুন জ্বালা”, তখন মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনে ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। কাদা-পানিতে ভিজতে থাকা, অনাহারে থাকা তরুণ গেরিলা যোদ্ধারা যখন বুকে গ্রেনেড আর হাতে রাইফেল বেঁধে শত্রুর বাঙ্কারের দিকে ধেয়ে যেতেন, তখন নজরুলিয় এই দ্রুত-দাদ্রা তালের সুর তাঁদের ধমনীতে বইয়ে দিত অমিত সাহস। পরাধীনতার শত বছরের শিকল ভেঙে এক নতুন স্বাধীন পতাকাকে ছিনিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই গান ছিল রণাঙ্গনের সবচেয়ে বড় আত্মিক জ্বালানি।
‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ আসলে সব ধরনের অচলায়তন-দুর্বৃত্তপনা ও বৈষম্য ভাঙার গান। তাই তো ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রক্তে রাঙানো রাজপথ ও নতুন ভোরের ঝঞ্ঝা হিসেবে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে এ অবিনাশী গান। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে নজরুলের এই গানের এক তীব্রতম ও রক্তাক্ত প্রয়োগ দেখেছিল বিশ্ব। স্বৈরাচারের নির্দয় বুলেটে যখন রাজপথ শত শত তাজা তরুণের রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, শাহবাগ, সাভার, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা ব্রিজ কিংবা উত্তরা থেকে শুরু করে চিটাগাং রোডসহ সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস আর রক্তে ভেজা পিচঢালা রাস্তায় যখন কাঁদানে গ্যাস ও তাজা বুলেটের ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার, তখন এই গানের অগ্নিঝরা সুর আর তরুণদের স্লোগান একাকার হয়ে বুলেটের ভয়কে জয় করেছিল। Ñতখনই সাউন্ডবক্সে আর কোটি ছাত্র-জনতার গলায় গর্জে উঠেছিল নজরুলের এই কালজয়ী হুঙ্কার! Ñ“কারার ঐ লৌহ-কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট!” শহীদ আবু সাঈদের দু’হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেওয়ার অনমনীয় দৃশ্য যেন নজরুলের ‘পাগলা ভোলা’রই এক আধুনিক রূপ। রক্তে ভেজা গ্রাফিতি, মিছিলে মিছিলে উঠা স্লোগান আর সাউন্ডবক্সের এই গর্জন মিলে বুলেটের ভয়কে তুচ্ছ বানিয়ে দিয়েছিল সে সময়। নজরুলের ‘হায়দরী হাঁক’-এ গর্জে উঠে ছাত্র-জনতা সেদিন কয়েক দশকে গড়ে ওঠা স্বৈরাচারের লৌহ-কপাটকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন এক স্বাধীন ভোরের জন্ম দিয়েছিল।
উল্লেখ্য, ভাঙার গান বিষয়ে হুগলি জেল জীবনের একটি মজার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন। ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিলে কবি নজরুল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে হুগলি জেলে স্থানান্তরিত হয়ে আসেন। গান আর কবিতায় মাতিয়ে তুলেন পুরো জেলখানা। তখন এখানে ছিলেন কবি মঈনুদ্দীনসহ অনেক রাজবন্দি। তিনি বলেন- “একদিনকার একটি সামান্য ঘটনায় আমাদের ওপর সাধারণ-কয়েদীরা বিরূপ হয়ে উঠলো। এই ঘটনার আগে সাধারণ-কয়েদীরা আমাদেরকে ফেরেশ্তার মতো শ্রদ্ধা করতো, ভক্তি করতো। যে ক্ষুদ্র এবং হাস্যস্পদ কারণে তারা রাজ-বন্দীদের কাজের প্রতিবাদ করলো-তা শুনে পাঠকও হয়তো হেসে উঠবেন। বরিশালের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক একদিন বিকালে কবির একটি গান গাইছিলেন। এতে আছেঃ “লাথি মার ভাঙরে তালা, যতো সব বন্দী-শালায়” ইত্যাদি। সাধারণ কয়েদীদের রাগ হলোঃ স্বেচ্ছাসেবকেরা তাদের ‘বন্দী-শালা’ (শ্যালক) বলে গাল দিয়েছেন। প্রথমে ব্যাপারটা আমাদের বোধগম্য হয়নি। কিন্তু সন্ধ্যা ছ’টার সময় সমস্ত সাধারণ-বন্দী তাদের ওয়ার্ডের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়েই রইলো। দৃঢ়ভাবে তারা বল্লেঃ এর প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত তাদের কেউ কামরায় প্রবেশ করবে না। প্রত্যেকের মুখে চোখে একটা বিদ্রোহের ভাব যেন ফুটে বেরুচ্ছে। আমরা নির্দিষ্ট সময়ে যার যার সেলে গিয়ে বন্ধ হয়েছিলাম। পরে শুনলামঃ স্বয়ং জেলার কতিপয় সংগীনধারী ওয়ার্ডারসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাপারটা আগাগোড়া শোনেন। তারপর আমাদের ভিতর থেকে মুরুব্বী শ্রেণীর মওঃ আফসার উদ্দীন আহমদ এবং পণ্ডিত সামধ্যায়ীকে নিয়ে গিয়ে তাদের গানের মানে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বন্দীশালা, মানে যে বন্দী শ্যালক নয়, বন্দীখানা বা বন্দীআলয়-এই কথাটি তাদের বোঝাতে সেদিন পাক্কা অর্ধঘণ্টা সময় ব্যয় হয়েছিল। এরপর সাধারণ-কয়েদীদের সাথে আমাদের আর কোনো বিরোধ বাধেনি।”
বস্তুত কলকাতার আলিপুর জেল মিউজিয়ামের নিঃসঙ্গ ‘নজরুল সেল’ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর রক্তঝরা রণাঙ্গন কিংবা ২০২৪-এর জুলাইয়ের বিপ্লব-ঝঞ্ঝাÑ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ গানটি প্রমাণ করেছে যে বিপ্লবের কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা বয়সের মেয়াদ থাকে না। এটি কোনো নির্দিষ্টকালের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চিরন্তন মানবাত্মার মুক্তির জয়গান। যতক্ষণ জগতে পরাধীনতার শৃঙ্খল থাকবে, যতক্ষণ অন্যায় আর বৈষম্যের প্রাচীর মানুষকে বন্দি রাখতে চাইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলামের এই গান মিটিং, মিছিল, রাজপথ ও মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে চির-আবেদনময়ী হয়ে অগ্নিস্ফূলিঙ্গ ছড়াতেই থাকবে। বিপ্লবীদের বুকে কালবৈশাখী ঝড় তুলে মুক্তির জয়গান গেয়ে যাবে। প্রতিবাদে-প্রতিরোধে-বিপ্লবে-বিদ্রোহে-যুদ্ধে-সংগ্রামে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বাঙালি আজও এই গানের কাছে আশ্রয় খোঁজে।
লেখক :
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
শিক্ষক ও নজরুল গবেষক
রাজশাহী