মঙ্গলবার, ৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুর। একটি মুহূর্ত, শেষ বাঁশি, পরাজয়- বহু বছরের স্বপ্নকে মুছে দিতে যথেষ্ট। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচ শেষে যখন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ঘাসে বসে চোখের জল লুকাতে পারছিলেন না নেইমার, তখন কাঁদছিলেন শুধু একজন ফুটবলার নন; কাঁদছিল এক প্রজন্মের স্বপ্ন।
ম্যাচ শেষে তার কণ্ঠে শোনা গেল, ‘সব শেষ। এখানেই আমার শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ হলো।’ কথাগুলো আনুষ্ঠানিক অবসর ঘোষণা নয়। কিন্তু এতটাই ভারী যে ব্রাজিল সমর্থকদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে- তবে কি সত্যিই শেষ হয়ে গেল ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের পথচলা?
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। কিশোর বয়সেই তাকে বলা হয়েছিল ব্রাজিলের পরবর্তী মহাতারকা। সেই সময় থেকেই তার কাঁধে তুলে দেওয়া হয়েছিল এমন এক প্রত্যাশা, যা একসময় বহন করেছিলেন পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনালদো কিংবা রোনালদিনিও। কিন্তু প্রতিভা, দক্ষতা আর অসাধারণ নৈপুণ্য থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপ শিরোপা নামের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি আর ছোঁয়া হলো না তার।
নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী দল নয়, ছিল তার নিজের শরীর। একের পর এক চোট তাকে থামিয়ে দিয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। ২০১৪ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে হুয়ান সুনিগার হাঁটুর আঘাতে পিঠের কশেরুকায় চিড় ধরেছিল। সেই ইনজুরির কারণে সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে খেলতে পারেননি তিনি। ব্রাজিলও ইতিহাসের অন্যতম লজ্জাজনক ৭-১ ব্যবধানে হেরেছিল।
চার বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে আবারও পায়ের গুরুতর ইনজুরিতে কয়েক মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল। অনেক লড়াই করে বিশ্বকাপে ফিরলেও পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে গোড়ালির চোট তাকে গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফিরে এসে গোল করলেও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে বিদায় নিতে হয় ব্রাজিলকে।
এই বিশ্বকাপেও ভাগ্য যেন তার প্রতি সদয় ছিল না। বয়সের ভার, দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ক্লান্তি এবং আগের চোটগুলোর প্রভাব নিয়ে টুর্নামেন্টে নেমেছিলেন তিনি। পুরো প্রতিযোগিতাজুড়েই দেখা গেছে, আগের সেই বিস্ফোরক গতি নেই, ড্রিবলিংয়ের ঝলকও কমে গেছে। তবু অভিজ্ঞতা, শৈল্পিকতা ও নেতৃত্ব দিয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফুটবল একার খেলা নয়। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল থেমে গেছে শেষ ষোলোতেই।
নরওয়ের বিপক্ষে বিদায়ের ম্যাচে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি আসে নেইমারের পা থেকেই। যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে তিনি ব্যবধান কমিয়েছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠেই ভেঙে পড়েন তিনি। সেই দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের ছুঁয়ে দেয়।
বিশ্বকাপের ম্যাচের পর দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেইমার বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, সত্যিই চেষ্টা করেছি। এখন সব শেষ।’ এই কথাগুলোকে ব্রাজিল জাতীয় দল থেকে তার বিদায়ের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ ২০৩০ বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৩৮ বছর। সেই বয়সে আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা বাস্তবতার বিচারে খুবই ক্ষীণ।
সংখ্যার হিসেবে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঈর্ষণীয়। ব্রাজিলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৮টি অ্যাসিস্ট তাকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলারদের কাতারে বসিয়েছে। গোলের হিসেবে তিনি ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিন্তু ফুটবলে পরিসংখ্যান সব গল্প বলে না। বিশ্বকাপ জিততে না পারার আক্ষেপ হয়তো এই অসাধারণ সংখ্যাগুলোকেও অনেকের চোখে অসম্পূর্ণ করে রাখবে।
জাতীয় দলের হয়ে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ। সেই টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ব্রাজিলকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে অধিনায়ক হিসেবে দেশের ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদকও এনে দেন। তবু ব্রাজিলের মতো ফুটবল পাগল দেশে একজন মহাতারকার মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ দিয়েই হয়।
নেইমারের ক্যারিয়ার নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। কখনো অতিরিক্ত নাটকীয়তা, কখনো ইনজুরি, কখনো ক্লাব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত- সবকিছু নিয়েই বিতর্ক ছিল। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই, সেটি হলো তার প্রতিভা। নিজের সেরা দিনে তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের একজন। এমন একজন ফুটবলার, যিনি একাই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারতেন।
আজ যখন বিদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তখন তার ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ‘যদি’ শব্দটি। যদি ২০১৪ সালে সেই ভয়াবহ চোট না পেতেন, যদি গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টগুলোর আগে বারবার ইনজুরিতে না পড়তেন, যদি আরও কিছুটা ভাগ্য তার পাশে থাকত- তবে হয়তো গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত।
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তিই বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। তবু তাদের অবদান কখনো ম্লান হয়নি। নেইমারের ক্ষেত্রেও হয়তো সেটিই সত্য হবে। তিনি হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলতে পারেননি। কিন্তু একটি প্রজন্মকে আনন্দ দিয়েছেন, বিস্মিত করেছেন, অসংখ্য শিশুকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছেন। তাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ঝরে পড়া সেই অশ্রু হয়তো কেবল একটি ক্যারিয়ারের সমাপ্তির ইঙ্গিত নয়। সেটি এমন এক অসমাপ্ত স্বপ্নের বিদায়, যা কোটি ব্রাজিল সমর্থক বহু বছর ধরে বুকে লালন করে এসেছেন।