বৃহস্পতিবার, ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সানশাইন ডেস্ক: ঢাকার বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন বরেণ্য চারুশিল্পী পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষমুস্তাফা মনোয়ার।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩ টায় বনানী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন তার ছেলে সাদাত মনোয়ার। তিনি বলেন, “আমার নানা তোফায়েল উদ্দিন আহমেদের কবরে তিনি শায়িত হয়েছেন।”
এর আগে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর সোয়া ২টায় অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা। সেখানে অভিনয়শিল্পী আবুল হায়াত, শহীদুজ্জামান সেলিম, সালাহউদ্দিন লাভলু, রাশেদ মামুন অপু, হাবিবুর রহমান খান, খোরশেদ আলম খসরুসহ চ্যানেল আই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আরও অনেকে জানাজায় অংশ নেন।
জানাজা শুরুর আগে চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের সবার গুরুজন। তার সঙ্গে আমাদের সখ্যতা দীর্ঘদিনের। চার বছর আগে তার নামে আমরা চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে একটি স্টুডিওর নামকরণ করেছি।” তিনি বলেন, “দীর্ঘ কয়েক দশকের শিল্পসাধনা, টেলিভিশন, চিত্রকলা, পাপেট আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক জাগরণে মুস্তাফা মনোয়ারের অসামান্য অবদান বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
মুস্তাফা মনোয়ারের শেষ বিদায়ের কাজ শুরু হয় মঙ্গলবার সকালে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণ দিয়ে। সেখানে এই শিল্পীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ বিটিভি প্রাঙ্গণ থেকে শহীদ মিনারে পৌঁছায় বেলা ১১টায়। ওই সময়ের আগে থেকেই সেখানে জড়ো হন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকে। পাশাপাশি এসেছিলেন বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও।
শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে এস আই সাইফুল আলমের নেতৃত্বে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সে সময় বিগিউলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ নেওয়া হয় তার কর্মজীবনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই সব্যসাচী শিল্পীর মৃত্যু হয়। মুস্তাফা মনোয়ারের বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। সবশেষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন মুস্তাফা মনোয়ার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। অবস্থার কিছুটা উন্নতি দেখে কয়েক দিন আগে তার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে শারীরিক অবস্থার আবার অবনতি হলে তাকে ফের ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে আর ফেরানো যায়নি।
চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্প গবেষক, বাংলাদেশে পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ-বহু পরিচয়ে পরিচিত তিনি। তার এত পরিচয়ের পেছনের কারণ পারিবারিক আবহ। তার বাবা কবি গোলাম মোস্তফা, যিনি শুধু কবিতাই লিখতেন না, ভালো গানও গাইতেন। । ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে নানা বাড়িতে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম। ডাক নাম ছিল মন্টু। বরেণ্য এই শিল্পীর পৈত্রিক নিবাস ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে।
স্কুলে থাকতে বাবার ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি করতেন মুস্তাফা মনোয়ার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সবার ছোট। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা জমিলা খাতুনকে হারান মুস্তাফা মনোয়ার। ছেলেবেলা থেকেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান তৈরি হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের মনে। ১৯৫২ সালে তিনি যখন নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র, সে সময়েই তিনি প্রতিবাদী কিশোর। ভাষা আন্দোলন নিয়ে এঁকেছিলেন কার্টুন। ফলে পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে পড়ে মাসখানেকে জেলে থাকতে হয়েছিল।
ম্যাট্রিক পাস করে মুস্তাফা মনোয়ার চলে যান কলকাতায়, সেখানকার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে তার ভালো লাগেনি। পরে ভর্তি হন কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে।
জলরঙে ভালো ছবি আঁকতেন মুস্তাফা মনোয়ার। আর্ট কলেজে পড়ার সময়ই কলকাতায় শিল্পী হিসেবে তার পরিচিতি তৈরি হতে থাকে। চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি খুব অল্পতে কথা বলতে পারে। কলকাতার সেই দিনগুলোতে নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করেছেন মুস্তাফা মনোয়ার। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর ছাত্র সন্তোষ রায়ের কাছে গান শিখতে শুরু করেছিলেন। শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে ছিলেন বছর তিনেক।
পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, তাতে যোগ দিয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন এই চিত্রশিল্পী। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন মুস্তাফা মনোয়ার। পরের বছর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের এক ছেলে সাদাত মনোয়ার ও এক মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার।
নিজেকে কেবল চজারুকলার গণ্ডিতে আটকে রাখেননি মুস্তাফা মনোয়ার। তার আগ্রহ এবং কাজের জায়গা ছিল টেলিভিশনন। ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে চারুকলার চাকরি ছেড়ে সেখানে যোগ দেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার টেলিভিশনে যোগ দেওয়ার কারণ ছিল বৈরী সময়ে বাংলার সংস্কৃতিকে সামনে তুলে ধরা। তখন টেলিভিশনে দিনের অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে পতাকা ওড়ানো দেখানো হত। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ মুস্তাফা মনোয়ারসহ পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ঠিক করলেন, পাকিস্তান দিবসে তারা পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে দেখাবেন না।
সেজন্য তারা এক কৌশল করলেন। দিনের অনুষ্ঠানমালা শেষ হওয়ার কথা রাত ১০টায়। কিন্তু সেদিন তারা অনুষ্ঠান শেষ করতে রাত ১২টা পার করে দিলেন। ততক্ষণে তারিখ বদলে ২৪ মার্চ হয়ে গেছে। তখন পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা হল বটে, কিন্তু পাকিস্তান দিবসে তারা পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে দেখানো হল না।
ওই মাসেই টেলিভিশন থেকে ফজল-এ- খোদার রচনায় এবং আজাদ রহমানের সুরে ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতটি প্রচারিত হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায়। গানটি গেয়েছিলেন দশজন শিল্পী, কিন্তু যখন গানটি প্রচারিত হয় তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল যেন কয়েকশ শিল্পী একত্রে গানটি গাইছেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানও অনন্য। ১৯৭৩ সালে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর টেলিভিশন নাট্যরূপ দেন মুস্তাফা মনোয়ার। শেক্সপিয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকটিও বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায়। যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্টি অব টিভি ড্রামা’র জন্য এই নাটক দুটি মনোনীত হয়েছিল।
দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট মিশুকের নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ারই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল রঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপন করেছিলেন। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানেরও নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ার। তার নির্মিত অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ও সমাদৃত হয়।
বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মুস্তাফা মনোয়ারের। ‘পাপেটম্যান’ হিসেবে পরিচিত মুস্তাফা মনোয়ারকে ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ আকৃষ্ট করেছিল। তাকেই বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের পুরোধা বলা হয়।
কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার আছে। প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট দারুণ প্রশংসিত হয়।
১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি ডকুমেন্টারিতে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেই শরণার্থীশিবিরেই আয়োজন করেন পাপেট শো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মুস্তাফা মনোয়ার মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ। তার অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ দেখে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন; তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি।
টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে নিয়মিতভাবে প্রদর্শনী হয় মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’। বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপ মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করা মুস্তাফা মনোয়ার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।
এছাড়া জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকও ছিলেন তিনি। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পাওয়া এই শিল্পী বর্ণিল কর্মজীবনে আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯০ সালে টিভি নাটকের জন্য টেনাশিনাস পদক, ১৯৯২ সালে চারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে শিশু শিল্পকলা কেন্দ্র কিডস কালচারাল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম কর্তৃক কিডস সম্মাননা পদক, ২০০২ সালে চিত্রশিল্প, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশুকেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।