মাতৃভাষার জন্য দুর্বার সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল চাটমোহরে

জাহাঙ্গীর আলম, চাটমোহর: মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন ও আত্মত্যাগে পাবনার চাটমোহরে ভাষা সংগ্রামীরাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছিলেন। মাতৃভাষার জন্য গড়ে তুলেছিলেন দুর্বার আন্দোলন।
এ কারণে অনেককে জেল-জুলুম নির্যাতন সইতে হয়েছে। যা আজো স্মরণীয় হয়ে আছে। তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই।
একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের আগুন।
২২ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনার প্রতিবাদে পাবনার চাটমোহরের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে। তারা নেমে পড়ে রাজপথে। ওই দিনই পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের সে সময়ের ছাত্রনেতা কামাল লোহানী, আব্দুল মতিন, রণেশ মৈত্র, আব্দুল আজিজ, আশরাফ আলী চাটমোহরে আসেন ছাত্রদের সংগঠিত করতে।
সাংগঠনিকভাবে ভাষা আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে চাটমোহর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে কমিটি গঠন করা হয়। চাটমোহর রাজা চন্দ্র নাথ ও বাবু শুম্ভু নাথ পাইলট (মডেল) উচ্চ বিদ্যালয়ের কদমতলায় সেই দিনের সভায় সভাপতিত্ব করেন বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা অ্যাডভোকেট গৌড় চন্দ্র সরকার।
সভায় অন্যদের মধ্যে ছিলেন আব্দুর রহিম সরকার, আব্দুল লতিফ সরকার, আব্দুল হামিদ সরকার, ওমর আলী, ইছহাক দীপু, ক্ষিরদ সরকার, হাবিবর রহমান, মমতাজ খতিব, হবিবর রহমান, আবুল হোসেন, আব্দুল সালাম প্রমুখ। সবাই তখন ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ছাত্র।
সভায় ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। সভা শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঐতিহাসিক বালুচর খেলার মাঠে এলে কলেজ ছাত্ররা এবং চাটমোহরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মিছিলে যোগ দিয়ে আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলেন। বালুচর খেলার মাঠে ময়েন উদ্দিনের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বক্তারা ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার শপথ নেন। একই সঙ্গে ক্লাস বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
ওই সভার পর মিছিল নিয়ে ছাত্ররা থানা মোড়ে গিয়ে আরেকটি পথসভা করে। পরে পাবনা থেকে আসা ছাত্রনেতারা ট্রেনযোগে ভাঙ্গুড়া চলে যান। ২৩ ফেব্রুয়ারি চাটমোহর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে স্কুলের সামনে সমবেত হয়। সেখান থেকে মিছিল রেব করার সময় হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক খন্দকার তোফাজ্জল হোসেনের সহায়তায় চাটমোহর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিশান আলী পুলিশ সহ মিছিলে বাধা দেয়।
মিছিলে অংশগ্রহণকারী আব্দুর রহিম সরকার, আব্দুল হামিদ সরকার, গৌড় চন্দ্র সরকার, মমতাজ খতিব, হাবিবুর রহমান, মহরম হোসেন, আবুল হোসেন ও আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। অবশ্য বিকেলেই থানা থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
২৪ ফেব্রুয়ারি চাটমোহর হাইস্কুলের কদমতলায় শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র চৌধুরীর সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এবং ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাশেষে একটি মিছিল থানা মোড়ে এসে আবুল হোসেন ২৮ ফেব্রুয়ারির ব্যাপক কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে উপজেলার মথুরাপুর গ্রামের বাড়ি থেকে আন্দোলনের অন্যতম নেতা আবুল হোসেনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে তাকে পাবনা জেল হাজতে পাঠানো হয়। পাবনা জেল হাজতে এক মাস এবং রাজশাহীতে ৮ দিন আটক রাখার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
সে সময় জেল হাজতে ছিলেন আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন), বামনেতা অমূল্য লাহিড়ী, কামাল লোহানী, রণেশ মৈত্র, আমজাদ হোসেন, মাহবুবুল আলম, আব্দুল মমিন তালুকদার, আমিনুল ইসলাম বাদশা, গোলাম কিবরিয়া, উকিল প্রমূখ।
জেল থেকে বেরিয়ে স্কুলে আবুল হোসেনকে বন্ড (মুচলেকা) দিয়ে আবার নতুন করে লেখাপড়া করতে বলা হয়। ঘৃণা আর অভিমানে তিনি ফিরে যাননি সেই স্কুলে।
ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া আমিনুল ইসলাম বাদশা, আবুল হোসেন, আব্দুল হামিদ সরকার, মহরম হোসেন, ওমর আলী সহ প্রায় সবাই মারা গেছেন। বেঁচে ছিলেন চাটমোহরের ভাষা সংগ্রামী অ্যাডভোকেট গৌড় চন্দ্র সরকার তিনি লালন করতেন একুশের চেতনা। তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন।


প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ | সময়: ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ