সবুজে মোড়া বরজ, তবু হাসি নেই পান চাষিদের

মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় এবার পানের বা¤পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় চাষিদের মুখে হাসির বদলে নেমে এসেছে হতাশার ছায়া।
সরেজমিন জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী চকবরকত এলাকার ভুটিয়াপাড়া, কাঁনচপাড়া, তেঁতুলঝড়া, মাটিডালি সহ কয়েকটি গ্রামের মাঠজুড়ে এখন সবুজে মোড়া পানের বরজ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে পানপাতার সজীব সুবাস। একই অবস্থা পাঁচবিবি উপজেলার বাগজানা ইউনিয়নের আটাপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, রতনপুর, মোড়েরহাট সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মাঠে এখন শুধুই সবুজে মোড়া পানের বরজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গত প্রায় ১৫ বছর থেকে ভারত সীমান্তবর্তী এসব গ্রামে ব্যাপক হারে পানচাষ হচ্ছে বলে জানা যায়। তুলনামুলক ভাবে অন্যান্য ফসলের চেয়ে পান চাষে কৃষকরা অধিক লাভবান হওয়ায় এসব এলাকায় ক্রমেই বেড়েছে পান চাষ।
এছাড়া বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে পান। আতিথেয়তা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক আড্ডায় পান অপরিহার্য এক উপাদান। তাই এ ফসলের ভালো ফলনে চাষিরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, হয়তো এবার পরিশ্রমের ফল মিলবে, কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানো যাবে। কিন্তু বাজারে পানপাতার দর পড়ে যাওয়ায় তাদের সেই আশা এখন ¤¬ান হয়ে যাচ্ছে।
সদর উপজেলার ভুটিয়াপাড়া গ্রামের পানচাষি সহিদুল শেখ, আসলাম, আতিয়ার বলেন, এবারে ভাল ফলন হলেও এখন পান বিক্রি করে কোনো লাভ হচ্ছে না বরং লোকসান দিতে হচ্ছে। সার, কীটনাশক, সেচ আর শ্রমিকের মজুরি, সবকিছুর দাম বেড়েছে। আগে যে পান বেচে ৫০ টাকা পাওয়া যেত, এখন সেটি ২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে খরচও উঠছে না।
পাঁচবিবি উপজেলার রতনপুর, মোড়েরহাট, রামভদ্রপুর গ্রামের পানচাষি আব্দুস সাত্তার, সুবাশ, হৃদয়চন্দ্র বললেন, এ বছর আমাদের পান বেশ ভালো ফলেছে, কিন্তু বাজারে দাম নাই। ১০০ পিস পান এখন ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের বছর এই দামে অর্ধেক পানও পাওয়া যেত না। তাই এবারে খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
একই এলাকার তরুণ পানচাষি ইমরান হোসেন বলেন, পানচাষ আমাদের পৈত্রিক পেশা। এবার ফলন খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু বিক্রি কম সেই সাথে দামও কম। বাজারে পাইকাররা ইচ্ছামতো দাম বলে। আমরা বাধ্য হয়ে কম দামেই বিক্রি করি। আরেক চাষি সোহরাব আলী বলেন, আমি গত ১৫ বছর ধরে পানচাষ করছি। এমন ভাল ফলন অনেক দিন দেখিনি, কিন্তু এই রকম দামের অবস্থা আগে কখনো হয়নি। পান রাখার জায়গা না থাকায় কম দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই।
পানচাষি রওশন আরা বেগম জানালেন, পানচাষে নারীরাও সমান ভাবে পরিশ্রম করে। বরজে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করি। কিন্তু এখন লাভ তো দূরের কথা, ঘর চালানোই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, চাষিদের পাশাপাশি পান বাগানের শ্রমিকরাও বিপাকে পড়েছেন। আগে যেখানে প্রতিদিন কাজ পেতেন, এখন অনেক বরজেই কাজ কমে গেছে। ফলে আয়ও আগের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
জয়পুরহাট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, পানচাষ একটি পরিশ্রমসাপেক্ষ ফসল। কৃষি অফিস থেকে আমরা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে চাষিদের পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। এবার ফলন সত্যিই ভালো হয়েছে। তবে দামের বিষয়টি বাজারের চাহিদা ও যোগানের ওপর নির্ভর করে। কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আমরা সর্বদা সচেষ্ট আছি।


প্রকাশিত: নভেম্বর ১৭, ২০২৫ | সময়: ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ