বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সহ নানা সমৃদ্ধির বাংলাদেশ। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও ভরপুর এ দেশ। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর পর থেকে নানা ধর্মের অনুসারী নৃপতি, রাজা-বাদশাগণ শাসন করে গেছেন আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ। সেই থেকে রাজা-বাদশারা যুগযুগ ধরে সকলের মাঝে স্মরণীয় হয়ে থাকার আশায় নানা ধরনের জনকল্যান মুলক কাজ করে গেছেন।
মসজিদ, মন্দির, বিহার সহ বড় বড় জলাশয় খনন করেছেন। যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন ইমারত। এ সবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জয়পুরহাটের ঐতিহাসিক নান্দাইল দীঘি। এ দিঘীর রয়েছে স্বতন্ত্র ইতিহাস। নির্মাণ ও করুকাজ উভয় যেন বিমোহিত করে। যা আমাদের ভ্রমণ প্রেমীদের, এমনকি দেশী বিদেশী পর্যটকদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় প্রত্নকীর্তি।
প্রাকৃতিক সুন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি ঐতিহাসিক নান্দাইল দীঘি। যা জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় অবস্থিত। এলাকাটির মনোলোভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। বিশেষ করে শীতের আগমনে অতিথি পাখির সমাগম ঘটে। পিকনিক ও পর্যটকদের আগমন ঘটে কম-বেশী প্রায় সারা বছরই। তবে শীত কালে বেশী।
ইতিহাস খুঁজে জানা যায়, করতোয়া নদী খনন করার ফলে এ অঞ্চলের পানি ওই নদীতে নেমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ ফালগুন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে মাঠ, ঘাট শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যেত এক সময়। ফলে চারদিকে শুধু খাঁ খাঁ করতো এ এলাকা। সে সময়ে প্রজাকুলের দুঃখের কথা ভেবে রাজা নন্দলাল ১৬১০ খ্রীষ্টাব্দে বিশালায়তনে এই দীঘিটি খনন করেন। রাজা নন্দলাল থেকেই নান্দাইল দীঘির নাম করণ হয়েছে। এ দিঘীর আয়তন প্রায় একশত একর অথাৎ ৩শ বিঘা। এর মধ্যে ১৮০ বিঘা জলকর। স্বচ্ছ পানির দীঘিটি ১ কিলোমিটার লম্বাও বটে, আবার গভীরও বেশ।
দিঘীর চতুর্দিকে রয়েছে উঁচু নিচু টিলা এবং সবুজ শ্যামল বৃক্ষে পরিবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা। দীঘিটি সত্যিই পর্যটকদের আকর্ষণ কারে। জনশ্রুতি আছে, এ দীঘিটি মাত্র এক রাতেই খনন করা হয়েছিল বলে এমন ধরণের কথা অনেক প্রবীণদের মুখে শোনা যায়। সেই থেকে দীঘির তলদেশে কি আছে তাও বলতে পারেনা কেউ। এক সময়ে এই দীঘিতে চাপানো বৃক্ষ ও ঝোপঝাড়ও ছিল। আর এর মধ্যে লুকিয়ে থাকতো প্রহরীর ভূমিকায় অসংখ্য সাপ। পূর্ব পুরুষগণ সাপের ভয় উপেক্ষা করে যে যতটুকু পেরেছে ওই সব বন-জঙ্গল পরিস্কার করে দখলে নিয়েছে।
নান্দাইল দীঘিতে সেই সময়ের জল রাশিতে ঘুড়ে বেড়ানোর জন্য রয়েছে একটি নৌকাও। কালভেদে প্রতিদিন অসংখ্য দেশী বিদেশী পাখি, সাইবেরিয়ান হাঁস, অস্ট্রোলিয়ান হাঁস, বুনো হাঁস, সারস, কাউন পাখি, বকের সারি, রাজহাঁস, চীনা হাঁস সহ নাম না জানা বিভিন্ন প্রজাতির রং-বেরং এর পাখি এখনও দৃষ্টি কাড়ে।
শীত মৌসুমে এদের আগমনে জেগে উঠা চর ও স্বচ্ছ পানিতে এক অনন্য দৃশ্যের অবতারনা হয়। এছাড়া দীঘির টিলার উপর বসে প্রত্যুষে সূর্যোদয়ের দৃশ্য খুবই উপভোগ্য। চাঁদনী রাতে চাঁদের আলোতে মৃদু বাতাসে দীঘির স্বচ্ছ পানি সোনা-রুপার মত ঝলমল আলো দিয়ে উদার প্রকৃতি প্রেমিককে আহবান জানায়। তাই রাতে দীঘিটি হয়ে উঠে আরও আকর্ষনীয় ও মনোরম।
বগুড়া-জয়পুরহাট মহাসড়কের উত্তর পার্শ্বে বিশালায়তন দীঘিটি অবস্থিত। বগুড়া হতে বাস যোগে পুনট বাসট্যান্ডে নেমে অথবা জয়পুরহাট থেকে বাস যোগে কালাই বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিক্সা-ভ্যান যোগে নান্দাইল দীঘিতে যাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক দীঘিকে পর্যটন স্থান হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা। ভ্রমণকারীদের থাকার জন্য ১টি বড় ধরনের বিশ্রামাগার, ১টি রেস্টুরেন্ট, ১টি কৃত্রিম চিড়িয়াখানা, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, প্রবেশ পথ, ¯পীড বোট, এপার থেকে ওপার যাতায়াত করতে একটি ওভার ব্রীজ স্থাপন করা একান্ত প্রয়োজন। তাহলে যেমনি এর সৌন্দর্য ও গুরুত্ব বাড়বে তেমনি এখান থেকে সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ও আসার সম্ভাবনা আছে।
উত্তরাঞ্চলের একমাত্র দীঘি নান্দাইল দীঘিটিকে নতুন পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে দাবী করেছেন এলাকাবাসী। বিগত সরকারের আমলে অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানের মুল্যায়ন হলেও দীর্ঘদিন যাবৎ এই দীঘিটি অবহেলিত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার দীঘিটিকে পর্যটন অধিদপ্তরের হাতে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও অদ্যাবধি কিছুই হয়নি।
কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, ইতোমধ্যে পর্যটকদের জন্য একটি বিশ্রামাগার, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, একটি ¯িপডবোট, দুটি নৌকা, বসার জন্য কয়েকটি গোলঘর এবং বড়-ছোট মিলে তিনটি ঘাট স্থাপন করা হয়েছে। উন্নয়নের জন্য গত অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার কাজ চলমান রয়েছে।