বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: এক শ্রেণির লোক পাখি শিকারের পর বিক্রি করে। আরেক শ্রেণির লোক সেই পাখি দিয়ে রসনা তৃপ্তি মেটায়। এই দুই শ্রেণির মানুষের তান্ডবে দেশী বিদেশী হরেক প্রজাতির পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। তবে ব্যাতিক্রমও রয়েছে।
যেমন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কানাইপুকুর গ্রামের বাসিন্দারা। পাখির জন্য গ্রামের একটি মজা পুকুরের পাড়ে রীতিমতো অভয়য়াশ্রম গড়ে তুলেছে তারা। সেখানে কয়েক হাজার বিদেশী পাখির বাস। পাখিগুলোকে বাসা বাধতে সহায়তা করে গাঁয়ের লোকজন। এমনকি রাত-বিরাতে পাহারার ব্যবস্থাও থাকে ওই সব পক্ষীকূলের জন্য।
‘সন্ধ্যা থেকে পাখিগুলোর ডাকে হামরা তখন ঘুমে যাই। ফজরের নামাজের সময় আবার জোরে কিচিরমিচির শুরু হয়। তখন হামাকেরে ঘুম ভেঙ্গে যায়’। কথাগুলো বলেন, কানাইপুকুর গ্রামের কৃষক ইকবাল মন্ডল। এ যেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই গানের কলি, ‘কোথায় এমন খেলে তড়িৎ এমন কালো মেঘ/ সেথায় পাখির ডাকে ঘুমিয়ে পড়ে পাখির ডাকে জাগে’।
ক্ষেতলাল উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণে ১২ কিলোমিটার দুরে আলমপুর ইউনিয়নের ছোট একটি গ্রাম কানাইপুকুর। ওই গ্রামে আব্দুস সামাদ মন্ডল ও সোবহান মন্ডলের পুকুর পাড়ে শতাধিক গাছে শামুকখৈলসহ পাঁচ/ ছয় প্রজাতির পাখি বাস করে। কয়েক যুগ ধরে সেখানে বাসা বেঁধে আছে মাছরাঙ্গা, পানকৌড়ি, রাতচোরা ও বক সহ অন্যান্য প্রজাতির পাখি। আর এশিয়ান শামুকখৈল পাখি দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে স্থায়ী ভাবে বাস করছে গ্রামটিতে।
গ্রীষ্মকালে শামুকখৈল পাখি প্রজনন করে বংশ বৃদ্ধি করে এখানে। শামুকখৈল ছাড়াও এ পাখি শামুকভাঙ্গা, হাইতোলা মুখ নামে পরিচিত। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে পাখিরা এসে আশ্রয় নেয় গ্রামের মন্ডল পুকুরের গাছগুলোতে। বর্তমানে পাখিগুলো পুরোগ্রাম ছড়িয়ে গেছে। সন্ধ্যায় পুকুর পাড় সহ পুরো গ্রাম মুখরিত হয়ে ওঠে পাখির কলকাকলিতে। রাতভর শোনা যায় ওদের ডানা ঝাপটানো শব্দ। নির্বিঘ্নে রাত কাটিয়ে ভোর হলে উড়ে যায় ওরা। দিন শেষে আবার নীড়ে ফিরে।
গ্রামের পশ্চিম দিকে পুকুরের কাছাকাছি শনির জাঙ্গালখাড়ি (খাল) আছে। পাখি প্রেমীদের মতে ওই খাড়িই মূলত পাখিদের খাবারের প্রধান আশ্রয়স্থল। এখানে মাছ, শামুখ, ব্যাঙ, কাকড়া, ঝিনুক, পোকামাকর ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী পাওয়া যায়। সে কারণেই পাখিরা খাড়ির কাছাকাছি পুকুরপাড়ের গাছগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।
ওই গ্রামে গিয়ে কথা হয় পাখি দেখতে আসা ক্ষেতলাল ডায়াবেটিক সমিতির কো-অর্ডিনেটর আজিজুল হক এর সাথে। তিনি বলেন, এমন সুন্দর দৃশ্য গ্রামেগঞ্জে শহর বন্দরে পাওয়া কঠিন। সচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। পুকুরের মালিক রাজশাহী জাদুঘরের সাবেক উপ-পরিচালক আব্দুস সামাদ ও তাঁর ছোট ভাই ছোবহান মন্ডল বলেন, পাখিগুলোকে আমরা বুক দিয়ে আগলে রেখেছি। এখানে পাঁচ থেকে ছয় প্রজাতির প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক পাখি আছে। তবে সবচেয়ে বেশী আছে শামুকখৈল। ২৫-৩০ বছর ধরে পাখিগুলো এখানে আছে। আব্দুস সামাদের স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মোহসেনা বেগম বলেন, অনেকদিন ধরে পাখি শিকারীরা এখানে আসতে পারে না। আর বন্দুকের গুলি ছুড়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এমনিতে গ্রামবাসী এ ব্যাপরে অনেক সচেতন। তার ওপর ৫-৬ জন তরুণ রাতেও মাঝেমধ্যে পাখিগুলোকে পাহারা দেয়। ছোবহান মন্ডলের পুত্র জাহাঙ্গীর মন্ডল বলেন, গাছের শুকনো ডালপালা যেসব দিয়ে পাখিরা বাসা বানায় তাঁরা সেসব কুড়িয়ে বাড়ির ছাদে এক জায়গায় স্তুপ করে রাখেন। পাখিরা সেখান থেকে সহজেই ডালপালা নিয়ে বাসা বানায়।
বাঁশঝাড় সংলগ্ন একটি বড় বটগাছে বর্তমানে বেশী আছে শামুক খৈল। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ আছে। তার মধ্যে বট, পাকুড়, জাম, তেতুল, আম, সেগুন, কড়ই অন্যতম। পাশের গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুল আলম তালুকদার, দৌলতপুর গ্রামের আবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, কানাই পুকুর পাখি কলোনি এখন পাখিদের জন্য অভয়াশ্রম। সেখানে বিদেশী পাখিরা এখন প্রজনন করে। পাখি কলোনি হিসেবে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ হাজার হাজার মানুষ পাখি দেখতে আসে এখানে। এছাড়া প্রকৃতিপ্রেমী কয়েকটি সংগঠনও গ্রামটির পাখি কলোনি পরিদর্শন করেছেন।
ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, গ্রাম অঞ্চলে এতো সুন্দর একটি পাখি কলোনি সত্যই দেখার মতো। সচেতন মহলের নিকট অনুরোধ পাখিগুলো যাতে না মারে। কারন এগুলো দেশের সম্পদ।