, , ।
সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী :
নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাণ পদ্মা পানির জন্য হাহাকার করছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পানিশূন্যতায় পড়ায় পদ্মা নদী এখন মরা খালে রূপ নিয়েছে। ফলে নদীনির্ভর জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। পদ্মার বুকজুড়ে বিস্তৃত চর আর ধুলোর মরুভূমিতে পরিণত হওয়া নদীর তলদেশ প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর ফেলছে চরম নেতিবাচক প্রভাব।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে ভারত গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে। পদ্মা নদীর উজানে ভারতের গঙ্গায় নির্মিত ব্যারাজটি প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের পদ্মাসহ এর শাখা নদ-নদীর গতিপথে এই বাঁধ বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবছর খরার মৌসুমে ভারত ওই ব্যারাজ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করায় পদ্মায় পানি সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। এতে চরম হুমকির মুখে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। দেখা দিচ্ছে মরুকরণের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি।
খোদ পদ্মার প্রবেশদ্বার রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলাতেই এখন পদ্মায় পানি নেই। পুরো নদীই এখন চর, শুধু সরু খাড়ির মতো একটা জলপ্রবাহ চলে গেছে এখান থেকে। স্রোতহীন সেই ছোট নদীতেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন নদীপাড়ের জেলেরা। অনেক জেলেই আবার পেশা ছেড়ে চলে গেছেন অন্য পেশায়। একসময়ের খরস্রোতা পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
তবে এর উল্টো চিত্রও রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কার সব গেট খুলে দেয়ার কারণে প্রায় প্রতিবছরই গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা দিচ্ছে বন্যা ও ভাঙনের সমস্যা।
লেখক ও গবেষক বেনজিন খান বলেন, ‘ভারত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভাগিরথি নদীতে পলিমুক্ত পানি সরিয়ে নিচ্ছে। আর ভরামৌসুমে আমাদের পলিযুক্ত পানি দিচ্ছে। এতে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। বন্যায় আমরা ডুবে যাচ্ছি। ভারত এভাবে দীর্ঘমেয়াদে গণহত্যা চালাচ্ছে।’
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানান, ভারত ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর পানি প্রত্যাহারের কারণে ১৯৮৪ সালের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে রাজশাহী অংশের গঙ্গায় আয়তন কমেছে ৫০ শতাংশ। পানির গভীরতা কমেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রবাহ কমেছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণের সুন্দরবনে মিঠাপানির সরবরাহ কমেছে ৯০ শতাংশ। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারিতে গঙ্গায় পানি প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারিতে পানি প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেক। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে গঙ্গায় পানি প্রবাহ কমেছে ১৫ হাজার ৩২১ কিউসেক। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে জনজীবনে।
গোদাগাড়ী উপজেলার রেলওয়ে বাজার এলাকার বাসিন্দা শ্রী চরণ মন্ডলের বয়স এখন (৮০)। যখন তার বয়স ৭ বছর, তখন থেকেই বাবার সঙ্গে নদীতে গিয়ে মাছ ধরা শুরু করেছিলেন। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে উত্তাল পদ্মায় মাছ ধরেছেন। ফারাক্কার পর ধীরে ধীরে পদ্মার করুণ মৃত্যুও দেখেছেন। পানির অভাবে নদীতে মাছও কমতে শুরু করলে চরণ মন্ডল আর এ পেশায় থাকেননি। কথা হয় তার সঙ্গে। ফারাক্কার আগে নদী কেমন ছিল, জানতে চাইলে মুখে এক চিলতে হাসি এনে বললেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের আগে নদী বড় ছিল, মানে বহুত বড়। তখন নদীতে মাছ ভাল হতো। এক মাইল দূর থেকেই নদীর গর্জন শোনা যাইত। এখন তো পানিই নাই, শুধু চর। অল্প একটু নদী, মাছ নাই, জাইল্যা বেশি। এখুন মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
পদ্মার ওপারে চর আলাতুলি কলিমপাড়া গ্রামে বাড়ি আরশাদ আলীর (৭২)। তিনি বললেন, ‘এখন তো শুধু বর্ষার সময় নদীতে পানি। আর ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার আগে চৈত মাস, বৈশাখ মাস- সব সমাতিই নদীতে প্রবাহ লাইগ্যা থাইক্যাছে। তখন পানি ছিল ঘোলা। এখন তো একহাঁটুও পানি নাই নদীতে। ওরা (ভারত) তো বাঁধ দিয়ে সব ঘিরে লিয়্যাছে। এক-আধটু ঝুরুক-ঝুরুক করে পানি আসে, ওইটুকুই। কত ক্ষয়ক্ষতি আমাদের ফারাক্কা হওয়াতে! বহুত ক্ষয়ক্ষতি। নদীতে পানি থাকলে চাষাবাদে পানি পাওয়া যেত। নৌকায় চর থেকে মালামাল আনতে পারতাম। এখন পানি নাই, মালামাল আনতে ডাবল খরচ।’
ফারাক্কার প্রভাবে নদীতে বালুচর পড়ে কমে গেছে গভীরতা। ভরা মৌসুমে হঠাৎ করে ভারত যখন পানি ছেড়ে দেয়, তখন পদ্মা আর সেই পানি ধারণ করতে পারে না। প্লাবিত হয় নদীপাড়, দেখা দেয় ভাঙন। এমন ভাঙনে ২০ বিঘা জমি হারিয়েছেন গোদাগাড়ীর মাদারপুর গ্রামের বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বাবু। এখন শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুকেই সেমি ডিপ বসিয়ে চাষাবাদ করেন। বর্ষায় নদীতে পানি এলে আবার তার সব জমি ডুবে যায়। বন্ধ হয় আবাদ।
মোখলেছুর রহমান বাবু বলেন, ‘আমার মতো হাজার হাজার মানুষের জমি পদ্মায় হারিয়ে গেছে বর্ষাকালে। পৈত্রিক জমি এখন নদী হিসেবে সরকারি খাস। পানি কমে গেলে এই জমি এখন যে যতটুকু পারে চাষবাস করে। অনেক জমিই চাষের উপযোগী থাকে না বালুর লাইগ্যা।’
কথা হয় দেওয়ানপাড়া গ্রামের প্রবীণ জেলে হবি হালদারের (৭০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এক সময় নদীর একুল-ওকুল দেখা যেত না। প্রবল স্রোতে সারাবছর পানি যাইতো। তখন পানির গর্জনই শুনা যাইত দূর থাইকা। বড় বড় পাল তুলা নৌকা লিয়ে জাইল্যারা মাছ ধরতে যাইত। জালে আটকা পড়ত বাঘাইড়, আইড়সহ বড় বড় সব মাছ। ঝাকে ঝাকে ধরা পড়ত ইলিশ। এখন ইলিশ পাওয়া যায় না বললেই চলে। আইড়-বাঘাইড় তো হারিয়েই গেলছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর ১৯৭৭ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানিবন্টন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ উপযুক্ত পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছিল। এই চুক্তি অনুযায়ী বছরের সব থেকে কম প্রবাহের সময়কাল এপ্রিলের শেষ ১০ দিন ফারাক্কার প্রায় ৫৫ হাজার কিউসেক পানির মধ্যে বাংলাদেশ পাবে ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি। অপরদিকে ভারত পাবে ২০ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি। কোন কারণে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির পরিমাণ কমে এলে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য অংশের ৮০ ভাগ অর্থাৎ ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেক পানি পাবে। এটি ছিল চুক্তির গ্যারান্টি ক্লস। পরবর্তীতে এই গ্যারান্টি ক্লস বাদ দেওয়া হয় চুক্তি থেকে। আগামী বছর চুক্তির নবায়নের সময় এটি আবার অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসুদ বলেন, আগামী বছর ভারতের সঙ্গে ফারাক্কা চুক্তি শেষ হচ্ছে। নতুন চুক্তি নবায়নের সময় গ্যারান্টি ক্লস, যা শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে সেটা আবার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফারাক্কার সমস্যাকে বাংলাদেশের অস্তিত্বের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার সমাধানে রাজনৈতিক চাপ দিতে হবে। জনমত গড়ে তুলতে হবে। সমস্যার সমাধানে ঐক্যের বিকল্প নেই।
তবে নদী গবেষক মোহাম্মদ এজাজ বলছেন, ফারাক্কা বাঁধটিই অবৈধ। সেটি অপসারণ করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণ করতে হবে। শুধু গঙ্গার পানি চাইলে হবে না। মূল দাবি হতে হবে বাঁধ অপসারণ। এ দাবি আদায়ে যা করার দরকার তাই করতে হবে। এখন সময় এসেছে পদ্মার পানির নায্য হিস্যা আদায়ের।
সানশাইন / সাইফুল/শামি