বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী মহানগরীর সড়কগুলো যেন একেকটি রেস ট্র্যাক। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রধান সড়কে মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি ও বিকট শব্দে নগরবাসীর শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তরুণ বাইকারদের একটি অংশ যেন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রাস্তাকে নিজেদের খেলার মাঠে পরিণত করেছে। এসব বাইকের গর্জন ও গতির দাপটে শহরের সাধারণ মানুষ, পথচারী, এমনকি যাত্রীরাও পড়ছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
শুধু মাত্র উচ্চগতির বাইক চালানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আরও অনেক অনিয়ম। অনেক বাইকার ট্রাফিক আইন উপেক্ষা করে ওয়ান ওয়ে রুল ভঙ্গ করছে, ফুটপাত দিয়ে চলাচল করছে, এমনকি শব্দদূষণের মাত্রাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে সহনশীলতার সীমা। এতে করে শহরের পরিবেশ যেমন বিষিয়ে উঠছে, তেমনি বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
এই অবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হই স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। কিন্তু বাইকের আচমকা গর্জন আর বেপরোয়া গতির কারণে এখন রাস্তায় চলাই দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয় যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে হাঁটছি। এটা কি কোনো সভ্য শহরের দৃশ্য হতে পারে?
এমন অবস্থার মুখে নারীরাও নিরাপদ বোধ করছেন না। চাকুরিজীবী সুমাইয়া তানজিন জানান, অফিস শেষে বাসায় ফিরতে ভয় লাগে। বাইকের গতির সঙ্গে সঙ্গে চালকদের চোখে-মুখে এক ধরনের তাচ্ছিল্য দেখা যায়। অনেক সময় বাজে মন্তব্যও শুনতে হয়। রাস্তায় হাঁটাও যেন এক প্রকার যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে শুধু পথচারীরাই নয়, এই বেপরোয়া বাইকারদের কারণে সমস্যায় পড়ছেন সুশৃঙ্খল ও নিয়ম মেনে চলা বাইকাররাও। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী রায়হান কবির বলেন, আমি নিজেও বাইক চালাই। কিন্তু রাস্তায় কিছু বাইকার যা করে, সেটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। তাদের জন্যই আমাদের মতো সচেতন বাইকারদেরও সবাই এক কাতারে ফেলে। এটা বন্ধ না হলে শুধু বদনামই নয়, দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়বে।
রিকশাচালকদের অবস্থাও ভিন্ন নয়। জীবন-জীবিকার তাগিদে রাস্তায় বের হলেও তাদের জন্য এখন প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছে আতঙ্কের। রিকশাচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিদিন বাইকারদের ভয় নিয়ে চলতে হয়। কখন কোন দিক থেকে এসে ধাক্কা দেবে, বলা যায় না। একবার যাত্রীসহ রিকশা উল্টে পড়েছিলাম এক বাইকের ধাক্কায়। এই ভয় এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী।
এ ব্যাপারে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, আমরা নিয়মিত চেকপোস্ট ও মোবাইল টহলের মাধ্যমে গতি ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তবে আমাদের সিসি ক্যামেরাগুলো বর্তমানে অকার্যকর, তাই নজরদারিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত সেগুলো সচল করার চেষ্টা চলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদপ্তরের গত বছরের জরিপে দেখা যায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিনগুন বেশি।
মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে আসে। সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ, ফুসফুসজনিত জটিলতা, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা। এক্ষেত্রে শিশু ও প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (আরএমসিএইচ) অধ্যাপক ডা. এ এস এম আব্দুল্লাহ জানান, আমাদের হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যারা আসে, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। এই হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এমন এক পরিস্থিতিতে রাজশাহীর একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিক ও সাংবাদিক সরদার আব্দুর রহমান বলেন, শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, তরুণদের আচরণগত পরিবর্তনের জন্য পুলিশি পর্যায়ে নিয়মিত কাউন্সেলিং বাড়ানো উচিত।