, , ।
ইবতিদা ফেরদৌস: “ইলিশ ছাড়া বৈশাখ পূর্ণ হয় না” এই বাক্যটি এখন যেন বাঙালির জাতিগত আবেগের প্রতিচ্ছবি। অথচ প্রশ্ন উঠছে, আদৌ কি পান্তা-ইলিশ ছিল পহেলা বৈশাখের আদি সংস্কৃতি? নাকি তা সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা এক ভোগবাদী রীতি ।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন উৎসব। কৃষিভিত্তিক সমাজে এক সময় নতুন বছরের সূচনায় হালখাতা করা, পুরনো দেনা-পাওনা চুকানো, দোকানে মিষ্টিমুখ করার চল ছিল। সেই সঙ্গে গ্রামীণ মেলাগুলোতে গান, নাচ, পুতুল নাচ, যাত্রা এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বৈশাখ পালন করতো সাধারণ মানুষ।
বাংলা সনের সূচনা মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। ফসলি সন নামক এই পঞ্জিকা চালু হয় রাজস্ব সংগ্রহ সহজ করতে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এটি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের মাধ্যম না থেকে রূপ নেয় সংস্কৃতির অনুষঙ্গে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নববর্ষের দিনটি ধীরে ধীরে সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এদিনে ইলিশের কোনও বিশেষ ভূমিকা ছিল না।
রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো আব্দুল বাসার জানান,“বৈশাখের শুরুর দিনটিকে কেন্দ্র করে উৎসব ছিল বটে, তবে ইলিশকে ঘিরে আজ যে উন্মাদনা দেখি, সেটা অতীতে ছিল না। এই সংস্কৃতি মূলত আধুনিক শহুরে প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে।”
এ দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক গুলোর পুরনো ফিচার ঘেঁটে দেখা যায়, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে শহরকেন্দ্রিক হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো পান্তা-ইলিশ মেনু চালু করে। মিডিয়ার প্রচার ও সামাজিক মাধ্যমের প্রসারে এটি রীতিমতো ট্রেন্ডে পরিণত হয়। শহরের অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো বৈশাখ উপলক্ষে ‘স্পেশাল ইলিশ প্লেটার’ চালু করে, যা এক সময় সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি বাধ্যতামূলক রীতিতে পরিণত হয়।
পান্তা ভাত একটি পরিশ্রমী কৃষকজীবনের চিহ্ন রাতের বেঁচে থাকা ভাত পরদিন সকালে খাওয়ার অভ্যাস। কিন্তু ইলিশ ছিল বর্ষাকালের মাছ। বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের কোনও ঐতিহাসিক যোগ নেই। বরং আজকের দিনে এসে এটি একটি ‘ল্যাভিশ ট্র্যাডিশন’-এ রূপ নিয়েছে, যেখানে উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যয়বহুলতা একটি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী জেলা সুজনের সভাপতি ও সামাজিক গবেষক আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন,“পান্তা-ইলিশ এখন শুধু খাওয়ার বিষয় নয়, এটি ফেসবুকে ছবি তোলার রীতি হয়ে গেছে। অথচ পান্তার পেছনের শ্রমজীবী জীবনের কষ্ট আমরা ভুলে গেছি।”
বর্তমানে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। রাজশাহীর সাহেব বাজারে ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায়। আর এক কেজি ও তার বেশি ওজনের মাছের দাম ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে ‘পান্তা-ইলিশ’ একটি সামাজিক লজ্জার কারণ হয়ে উঠছে।
কথা হয় সাহেব বাজারে বাজার করতে আসা অনেক ক্রেতার সঙ্গে। সবারই মুখে এক কথা “ইলিশ এখন ধনীদের খাবার”।
কলেজ শিক্ষক মফিজুল হকে আক্ষেপ করে বলেন, “ইলিশ তো আমাদের জাতীয় মাছ, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা কেবল ধনীদের সম্পদ। বছরের একটি দিন সপরিবারে ইলিশ খাওয়ার স্বপ্নটাও আর বাস্তব মনে হয় না।”
পহেলা বৈশাখ এমন একটি দিন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই অংশ নেয়। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা বলছে, এই দিনেও এক ধরনের বিভাজন তৈরি হচ্ছে। যারা ইলিশ কিনতে পারে না, তারা যেন উৎসব থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি কি আদৌ সার্বজনীনতা ধরে রাখতে পারছে?
তরুণ চাকরিজীবী তানভীর হোসেন বলেন, বৈশাখ এখন শুধু তাদের উৎসব, যাদের পকেট ভারী। আমরা শুধু টিভি আর সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে উৎসবটুকু বুঝে নিই।
রাজশাহী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নাহিদা আফরোজ বলেন, “সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা না থাকলে উৎপাদন বৃদ্ধি কোনো সুফল দেয় না। বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকলে, সাধারণ ভোক্তার ভোগান্তি লাঘব করা সম্ভব নয়। সরকারকে এই বিষয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।”
রাজশাহীর প্রায় প্রতিটি রেস্টুরেন্টে ‘পান্তা-ইলিশ প্লেট’ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায়। এই প্লেটে থাকে মাত্র একটি ছোট সাইজের ইলিশের টুকরো, খানিক পান্তা, কাঁচা মরিচ আর ভর্তা। প্রশ্ন উঠে এই ভোগবাদিতা কীভাবে জনমানুষের সংস্কৃতি হয়ে উঠল?
বৈশাখের আনন্দ যেন সকলের জন্য হয় এই হোক বাঙালির চেতনার মূলমন্ত্র। ইলিশ না থাকলেও পান্তা-ভাত, মাটির হাঁড়ি, পায়েস কিংবা ডালের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়াটাই সত্যিকারের উৎসব। পহেলা বৈশাখের শক্তি তার অন্তরের সারল্যে, বাহারি টেবিলে নয়।