বৃষ্টিহীন রাজশাহীতে দুশ্চিন্তায় আমন চাষি

সরকার দুলাল মাহবুব: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে রাজশাহী। আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণের প্রায় অর্ধেক দিন পেরিয়ে গেলেও বৃষ্টি নেই। বৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন চাষিরা। প্রলম্বিত খরায় পুড়ছে রাজশাহীর আমনের মাঠ। দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে ভারি বৃষ্টি হলেও রাজশাহীতে বৃষ্টির দেখা নাই। এরপরেও চাষিরা পুকুর বা খালের পানি ও গভীর নলকুপের পানি সেচ দিয়ে কোন রকম চারা রোপন করছেন। শীঘ্রই ভারি বৃষ্টি না হলে পানি সংকটে আমন ক্ষেত হুমকির মুখে পড়বে বলে জানিয়েছে কৃষি সংশ্লিষ্টরা। ফলে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আমনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৮৩ হাজার ৫৬৭ হেক্টর (প্রায় ছয় লাখ ২১ হাজার ৭৩৮ বিঘা) জমিতে। এর জন্য জেলায় এবার বীজতলা হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছরের চেয়ে এবারে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা বেশী হলেও এখন পর্যন্ত আমনচারা রোপন হয়েছে অর্ধেক। রোববার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রোপন হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর। রোপন ঘাটতি রয়েছে প্রায় সাড়ে ৫৩ হাজার হেক্টর (প্রায় দুই লাখ সাড়ে ৬৪ হাজার বিঘা)। জানা গেছে শ্রাবন মাসের মধ্যে আমন ধানের চারা রোপন না হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। দেখা দিবে খাদ্য ঘাটতি।
আষাঢ়-শ্রাবন এই দুই মাস বষার্কাল। আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবন মাসেরও ১৫ দিন চলে গেছে। তবুও বৃষ্টির দেখা নেই বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে অবস্থিত এই রাজশাহীতে। বীজতলার বয়সও বেড়ে গেছে। বুড়িয়ে যাচ্ছে কচি চারাগুলো। তাই সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় ও বীজতলা বয়স হতে থাকায় আমন রোপণ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা। রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আউশের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আমন চাষে প্রস্ততি শুরু করেছিলেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা।
বর্ষাকালের প্রথম থেকেই আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা ও সাথে সাথে বৃষ্টিপাত যেন চিরায়ত। আবার বৃষ্টির ধরন কখনো গুড়িগুড়ি, কখনো ভারি ও মুষলধারে। এদেশে আমনচাষ হচ্ছে বৃষ্টি নির্ভর। আষাঢ়ের প্রথম থেকেই কৃষকগণ কোমর বেঁধে নেমে পড়ের আমন রোপনে। কিন্তু চলতি বর্ষাকালে রাজশাহী জেলায় কোথাও তেমন কোন বৃষ্টিপাত হয়নি। তারপরেও কোন কোন এলাকায় জমিতে চাষিরা আমন ধানের চারা রোপন করেছেন। আবার বৃষ্টির অভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকার আমন ক্ষেত বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফেটে যাচ্ছে রোপনকৃত ধানের ক্ষেত। এরআগে প্রচন্ড খরায় বোরো আবাদেও মার খেয়েছেন চাষিরা। সেচ নির্ভর বোরো আবাদের শেষের দিকে গভীর নলকুপ থেকেও পানি না উঠায় অনেক স্থানে বোরো আবাদ বাঁচানো যায়নি। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে অনাকাঙ্খিতভাবেই।
জেলার প্রায় অর্ধেক জমিতেই বৃষ্টি না হওয়ায় একদিকে এখনো আমন রোপণ করা যায়নি। অন্যদিকে সময়মত জমিতে রোপণ করতে না পারায় বীজতলায় নষ্ট হচ্ছে আমন চারা। চারাও পরিপক্ক অবস্থায় আছে। আষাঢ়ের ১২ থেকে ১৫ দিন পরেই বীজতলা থেকে চারাগুলো রোপণ করার কথা। কিন্তু শ্রাবনের ১৫দিন পেরুলেও বৃষ্টির দেখা নাই। এখন পর্যন্ত আমন রোপণ অর্ধেকের কিছুটা বেশী হয়েছে কৃষি অফিস। বৃষ্টির অভাবে আমন ধান রোপন নিয়ে উৎকণ্ঠা, হতাশা ও দুঃশ্চিন্তায় ভুগছেন চাষিরা।
রাজশাহীর পবা উপজেলা তেঘর গ্রামের কৃষক তারেক রহমান জানান, চলতি মৌসুমে ২ বিঘা জমিতে আমন চাষাবাদ করবেন। বীজও তৈরী হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে এখনো রোপন করা হয়নি। জেলার বরেন্দ্রখ্যাত তানোর উপজেলার শিবরামপুর গ্রামের কৃষক জহুরুল ইসলাম জানান, গত বছর আমন চাষ করে দাম না পেয়ে লোকসান গুনতে হয়েছিল। দু’একদিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে এ অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের বীজতলায় চারার বয়স বেড়ে যাবে। বীজের বয়স বেড়ে গেলে ফলন কম হয়।
এদিকে বৃষ্টির অভাবে অনাবাদি রয়েছে অনেক জমি। তবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অনেক কৃষক ডিপটিউবয়েল থেকে সেচ কার্যক্রম চালিয়ে ধান রোপন করছে। এতে কৃষকেরা প্রতি বিঘা জমিতে ৩শ’-৪শ’ বাড়তি গুণতে হচ্ছে। বর্তমানে সেচ দিয়ে লাগানো আমন ক্ষেতে বৃষ্টির খরায় ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোছা: উম্মে সালমা জানান, শ্রাবণ মাস পর্যন্ত কৃষকেরা আমন রোপণ করতে পারবেন। আমন চাষের সময় এখনো পেরিয়ে যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনে চাষের সময়ের হেরফের হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত চাষিরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৪ | সময়: ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ