নকল ওষুধের কারখানায় শ্রমিকদের জরিমানা

নুরুজ্জামান, বাঘা: মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য যে ওষুধ, সেই নকল ওষুধ দ্বারায় মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে! রাজশাহীর বাঘায় পুরোনো একটি বাড়িতে বিভিন্ন কোম্পানির নামে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় এমন ভয়াবহ চিত্র সামনে উঠে এসেছে। প্রশাসনের অভিযানে কারখানায় কর্মরত সাত শ্রমিককে পাওয়া গেলেও, পাওয়া যায়নি প্রকৃত মালিক কিংবা মূল পরিচালনাকারীদের। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা কারাদণ্ডের ব্যবস্থা না করে তাৎক্ষণিক এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু সেই এক লাখ টাকা কারা দিলেন, কোথা থেকে এলো, তা নিয়ে এখন জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন? দৈনিক ইত্তেফাক ও সানশাইনে প্রকাশিত এই খবরটি এখন সবার মুখে-মুখে ফিরছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বুধবার বিকেলে বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের তেঁথুলিয়া বাজার থেকে হাফ কিলোমিটার উত্তর পাশে একটি পুরোনো বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পায় উপজেলা প্রশাসন। এ সময় সাতজন শ্রমিককে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক লাখ টাকা জরিমানা করে তাদের ছেড়ে দেয় প্রশাসন।
কিন্তু কারখানার প্রকৃত মালিক এবং অর্থের জোগানদাতা কিংবা মূল হোতা কারা, তাদের কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, শ্রমিকদের এক লাখ টাকা দেওয়ার সামর্থ ও অর্থের উৎস কোথা থেকে এলো?
এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারখানায় কর্মরত সাত শ্রমিকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা কারাদণ্ডের ব্যবস্থা না করে শুধু এক লাখ টাকা জরিমানা করা হলো কেন? আরও বড় প্রশ্ন, তাৎক্ষণিক ভাবে এক লাখ টাকা পরিশোধের অর্থ কোথা থেকে এলো? শ্রমিকরা নিজেরা এই অর্থ দিয়েছেন, নাকি কারখানার মালিকপক্ষ কিংবা নেপথ্যের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি জরিমানার টাকা দিয়েছেন? যদি শ্রমিকরাই টাকা দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের প্রত্যেকের আর্থিক সামর্থ ও অর্থের উৎস কি ছিল? আর যদি অন্য কেউ টাকা দিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কে? জরিমানার অর্থ পরিশোধের বিষয়টি কি যথাযথ ভাবে নথিভুক্ত হয়েছে? অথবা যাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তাদের নাম কি কাগজে লিপিবদ্ধ হয়েছে? এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর চান স্থানীয় সচেতন নাগরিকরাগণ।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নকল ওষুধ তৈরির এই কারখানার কার্যক্রমের পেছনে একটি প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকতে পারে। অভিযোগ উঠেছে, হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিক পরিচয়ধারী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের কতিপয় ব্যক্তি নিয়মিত মাসিক আর্থিক সুবিধা নিয়ে এমন অবৈধ কারবার চলতে সহায়তা করেছেন। নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধেও মাসিক অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অনেককের মুখে-মুখে ফিরছে। যা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে সুশীল সমাজ ও অভিজ্ঞ মহলের দাবি, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু একটি নকল ওষুধের কারখানার ঘটনা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ একটি অপরাধী চক্রকে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এদিকে সরেজমিন বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনা স্থালে গিয়ে দেখা যাই, বাউসা ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ হাসমত আলী সিলগালা করা বাড়ির বারান্দায় বসে আছেন। তিনি জানান, রাতে ঐ বাড়িতে তারা পাঁচজন গ্রাম পুলিশ পাহারায় ছিলেন। এখন একাই অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে খোজ নিয়ে জানা যায়, বাড়ির মালিক হায়দার আলী ঢাকায় একটি চাকরি করার সুবাদে তিনি সেখানে থাকেন। তবে তার ভাই রাজার মোড়ের বাসিন্দা শামিম ও মা রিনা বেগম জানান, আজ থেকে ছয় মাস পুর্বে নাটোর এলাকার রেজাউল করিম, মাসিক আট হাজার টাকা মুল্যে বাড়িটি ভাড়া নেন। তবে ভেতরে কি হয় সেটি তাদের জানা নেই। তারা আরো জানান, রেজাউল করিম ‘নাটোর ভেজস মার্ট’ নামে একটি ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি বাড়ির মালিকদের কাছে জমা রেখেছেন। এটি নাটোর খোলা বাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে তোলা। এ সময় রেজাউল করিমের মোবাইল নম্বরে ফোন করলে তার নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।
এ সময় স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, বিকেলে পুলিশ একটি বাড়ির সন্ধান পেয়ে সেটিতে সিলগালা করলেও অদুরে বাউসা হেদাতি পাড়ায় অবস্থিত আরো একটি ফাঁকা জায়গায় অবস্থিত একটি বাড়ি ওই একই মালিক ভাড়া নিয়ে সেখানেও ওষুধ তৈরী করে চলেছেন। ঐ বাড়ির মালিকের নাম জিয়াউল হক। তিনিও ঢাকায় চাকরি করেন। সেখানে গিয়ে ছবি তুললে, ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন ঐ গ্রামের ষাটের্ধ্ব বয়স্ক আকছেদ মোল্লা।
এ বিষয়ে এলাকার সুধীজন ও অভিজ্ঞ মহল বলেন, নকল ওষুধ তৈরির কারখানা সিলগালা করলেই কি প্রশাসনের দায়িত্বের শেষ? কারখানার মালিক কে, কার অর্থায়নে এটি পরিচালিত হতো, কোথা থেকে কাঁচামাল আসত এবং উৎপাদিত নকল ওষুধ কোন কোন বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অভিযানকে পূর্ণাঙ্গ সফল বলা যায় না। বিশেষ করে সাত শ্রমিককে পাওয়া গেলেও মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া না যাওয়া এবং জরিমানার টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধের বিষয়টি আরও গভীর তদন্তের দাবি রাখে এলাকার মানুষ। তারা জানতে চান, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা না হওয়ার আইনগত কারণ কি? জরিমানার আদেশে কার নাম রয়েছে এবং অর্থ জমার রসিদে কার পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে, এসব তথ্যও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, শুধু শ্রমিকদের জরিমানা করে মূল অপরাধীদের আড়ালে রাখার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। কারখানার প্রকৃত মালিক, অর্থের জোগানদাতা, বাজারজাতকরণ চক্র এবং কথিত পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে হবে।
স্থানীয় সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবশালী কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারন মানুষের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে এমন ভয়ংকর প্রতারণার ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে একটি কারখানা সিলগালা হলেও একই চক্র অন্য কোথাও নতুন করে কারখানা গড়ে তুলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান অনন্যা এই প্রতিবেদককে জানান, থানা পুলিশের সহায়তায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী তিনি এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। অভিযানে বিভিন্ন কম্পানীর ভেজাল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে এবং কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। আর নকল ওষুধ তৈরির বিষয়টি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। এ সময় ঘটনার সাথে জড়িত সাত ব্যক্তির নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, এদের নাম পুলিশের কাছে পাওয়া যাবে।


প্রকাশিত: November 6, 2026 | সময়: 5:27 am | সুমন শেখ