লুপ্ত হচ্ছে তিন শতকের ইতিহাস, জঙ্গলে ঢাকা আবদালের মসজিদ

আরিফুজ্জামান তপু, বাগাতিপাড়া: ঝোপঝাড়ে ঢাকা ভাঙা ইটের দেয়াল। কোথাও পুরোনো ইটের গাঁথুনি, কোথাও লতাপাতা ও ফুলের কারুকাজের ক্ষীণ চিহ্ন। মাথার ওপর নেই ছাদ, নেই গম্বুজের পূর্ণ অবয়ব। মসজিদের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে বড় গাছ; তার শিকড় আঁকড়ে ধরেছে প্রাচীন দেয়াল। বহু বছর ধরে সেখানে শোনা যায় না আজানের ধ্বনি।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকমাহাপুর গ্রামের নীরব এই স্থাপনাটিই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘আবদালের মসজিদ’ নামে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় তিন শত বছরের পুরোনো এই মসজিদটি দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ে এখন বিলুপ্তির পথে। বছরের পর বছর ধরে স্থাপনাটির সংরক্ষণে কার্যকর সরকারি বা প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তাঁদের। ফলে একদিকে জঙ্গল ও গাছের শিকড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেয়াল, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো ইট ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ।
স্থানীয়দের দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত মসজিদটির জরিপ ও গবেষণা করা হোক। পাশাপাশি ঐতিহাসিক ভিটার সীমানা নির্ধারণ, জঙ্গল পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নদী, চুনশিল্প ও আবদাল সম্প্রদায়ের ইতিহাস: বাগাতিপাড়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে এই মসজিদের অতীত জড়িয়ে আছে বলে স্থানীয় ইতিহাসসচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন।
লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, একসময় পদ্মার শাখা বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন একটি নদী এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। নদীটি যোগাযোগের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল।
সে সময় নদীতে প্রচুর ঝিনুক ও শামুক পাওয়া যেত। এসব ঝিনুক-শামুক পুড়িয়ে তৈরি করা হতো চুন। তৎকালীন দালানকোঠার গাঁথুনি, প্লাস্টার ও অলংকরণে চুন ছিল গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রী। এই চুন উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিশেষ পেশাভিত্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠী—আবদাল সম্প্রদায়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যসচেতন স্থানীয়দের মতে, ‘আবদালের মসজিদ’কে শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাগাতিপাড়ার নদীকেন্দ্রিক জনপদ, ঝিনুক-শামুক থেকে চুন তৈরির প্রাচীন শিল্প, স্থানীয় অর্থনীতি এবং প্রায় হারিয়ে যাওয়া আবদাল সম্প্রদায়ের জীবন ও পেশার ইতিহাস।
নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর আমলে নির্মাণের দাবি: বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণাকারী অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর শাসনামলে চকমাহাপুর গ্রামের নদীতীরে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন মসজিদটি নির্মাণ করেন।
আজিজুর রহমানের মতে, সে সময় চুনশিল্প ছিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি। ওই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষরাই ধর্মীয় প্রয়োজন মেটাতে মসজিদটি নির্মাণ করেন। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশলের দিক থেকেও এটি তৎকালীন গ্রামীণ স্থাপত্যের একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন ছিল। পরে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে মসজিদটির নির্মাণকাল ও ইতিহাসের বিষয়ে সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক নথি বা প্রামাণ্য গবেষণা না থাকায় এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় ইতিহাসসচেতনরা।
চাষাবাদে নিচু হয়েছে ঐতিহাসিক ভিটা: স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় মসজিদটির ভিটা আশপাশের সমতল ভূমির চেয়ে অনেক উঁচু ছিল। মসজিদের পাশে আবদাল সম্প্রদায়ের বসতভিটার অস্তিত্বও ছিল বলে তাঁরা জানান। ওই এলাকায় আরও কিছু স্থাপনা মাটির নিচে দেবে গেছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
পরবর্তী সময়ে আশপাশের জমিতে চাষাবাদের জন্য মাটি কেটে সমতল করা হয়। এতে ঐতিহাসিক ভিটার উচ্চতা আগের তুলনায় অনেকটাই কমে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় মসজিদের আশপাশে আরও অনেক পুরোনো স্থাপনা ও ইট ছড়িয়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেউ কেউ পুরোনো ইট সরিয়ে নিয়ে গেছেন। এমনকি পাশের একটি নতুন মসজিদের প্রাচীর নির্মাণেও পুরোনো ইট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
আবদাল সম্প্রদায়ের চলে যাওয়ার সঙ্গে হারিয়ে যায় চুনশিল্প: স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কালের পরিক্রমায় নদীটি ভরাট হয়ে গেলে ঝিনুক ও শামুকের প্রাপ্যতা কমে যায়। একসময় বন্ধ হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী চুন উৎপাদনের কাজ।
জীবিকার তাগিদে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন পেশায় ছড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁদের অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে যান। তাঁদের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে তাঁদের নির্মিত এই মসজিদটিও।
বর্তমানে মসজিদের আশপাশের জমিগুলো যাঁরা ভোগদখল করছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন এলাকা ছাড়ার সময় এসব জমি হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
জঙ্গলের আড়ালে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ: সরেজমিনে দেখা যায়, চকমাহাপুর থেকে বাঘা ও আড়ানীর দিকে যাওয়ার পথে মূল সড়কের ডান পাশে একটি সরু রাস্তা। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে প্রায় ২০০ গজ এগোলেই জঙ্গলের আড়ালে চোখে পড়ে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ।
প্রায় ১৯ শতক জমির উঁচু ভিটার একটি অংশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপনাটির অবশিষ্ট দেয়াল। চারপাশে খেজুর, ভেন্না ও বিভিন্ন ধরনের ঝোপঝাড়ে জায়গাটি প্রায় ঢেকে গেছে।
মানুষের চলাচলও খুব কম। স্থানীয়রা জানান, সাপ-পোকামাকড়ের ভয়ে অনেকেই এখন সেখানে যেতে চান না।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে মসজিদের অবশিষ্ট স্থাপনাটি আনুমানিক ১০ ফুট লম্বা ও ১২ ফুট প্রস্থের বলে দেখা যায়। মাটি থেকে দেয়ালের বর্তমান উচ্চতা প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট। দেয়ালগুলোর পুরুত্ব আনুমানিক দেড় ফুট। ছোট ছোট পুরোনো ইট ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত দেয়ালগুলো এখনো অতীতের নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্য বহন করছে।
মসজিদের দরজাগুলোও স্থাপনাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দরজাগুলোর আকৃতি অনেকটা ইংরেজি ‘ট’ অক্ষরের মতো। দরজার গাঁথুনি আনুমানিক দুই ফুট পুরু। প্রতিটি দরজার ভেতরে প্রায় চার ফুট ফাঁকা জায়গা রয়েছে।
পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে এখনো লতাপাতা ও ফুলের হাতের কাজের মতো প্রাচীন কারুকাজের ক্ষীণ চিহ্ন দেখা যায়। পুরোনো নকশায় নির্মিত কয়েকটি দরজার চিহ্নও রয়েছে। দেয়ালের গায়ে এক-দুটি নকশা এখনো টিকে আছে। এসব নির্মাণশৈলীতে তৎকালীন কারিগরি দক্ষতার ছাপ রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
তবে মসজিদের ভেতরে জন্ম নেওয়া বড় গাছটি এখন স্থাপনাটির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছটির শিকড় ধীরে ধীরে দেয়ালের গাঁথুনির ভেতরে ঢুকে পড়ছে। দীর্ঘদিন ছাদহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় বৃষ্টি, রোদ ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের প্রভাবও স্পষ্ট।
‘পুরোনো মসজিদটি আমাদের আবেগের অংশ’: বর্তমান ভোগদখলকারী পরিবারের সদস্য মোস্তাক মণ্ডল বলেন, একসময় ওই এলাকায় আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতেন। তাঁদের কাছ থেকেই তাঁর পূর্বপুরুষেরা এই সম্পত্তির মালিকানা পান।
তিনি বলেন, প্রায় ১৯ শতক জমির পুরোনো ভিটাতেই আবদালের মসজিদটি রয়েছে। একসময় মসজিদের আশপাশে কয়েকটি বাড়িঘর থাকলেও পরে সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিছু স্থাপনা মাটির নিচে দেবে গেছে।
মোস্তাক মণ্ডল বলেন, “পুরোনো মসজিদটি এখন আমাদের কাছে আবেগ ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতির অংশ। সরকার যদি মসজিদটি সংস্কার করে কিংবা ঐতিহাসিক পুরোনো স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”
‘এখানে তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মসজিদটি আছে’: স্থানীয় প্রবীণ আলহাজ তছির উদ্দিনের বয়স প্রায় ১০০ বছরের কাছাকাছি। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এই ভিটাটাকে এমনভাবেই দেখে আসছি। আমাদের বাপ-দাদার সময়েরও আগে থেকে আবদালের মসজিদটি এখানে আছে বলে জানি। প্রায় তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মসজিদ এখানে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে মসজিদের চারপাশে আরও অনেক পুরোনো স্থাপনা ও ইটের প্রাচীর ছিল। পরে মানুষ সেগুলো নিয়ে গেছে। এখন শুধু এই দেয়ালগুলোই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’
স্থানীয় নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘এই স্থাপনাটি একসময় আরও অনেক উঁচু ছিল। চাষাবাদের কারণে আস্তে আস্তে নিচু হয়ে গেছে। জঙ্গলের কারণে এখন কেউ সহজে ভেতরে ঢোকে না। বিশেষ করে সাপ-পোকামাকড়ের ভয়ে মানুষ এড়িয়ে চলে। অথচ এই জায়গাটি আমাদের গ্রামের বহু পুরোনো ইতিহাস বহন করছে।’
সংরক্ষণের উদ্যোগের আশ্বাস: পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আবদালের মসজিদটি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিষয়টি নিয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলব। অন্তত জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করব। স্থানীয় মানুষকেও এ ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন হতে হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম বলেন, ‘আবদালের মসজিদটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’
ইতিহাস-ঐতিহ্যসচেতন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে মসজিদটির প্রকৃত বয়স, নির্মাণকাল, স্থাপত্যশৈলী ও আবদাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে এর সম্পর্কের প্রামাণ্য ইতিহাস অনুসন্ধান করা হবে। তা না হলে জঙ্গলে ঢাকা এই ভগ্নপ্রায় দেয়ালগুলোও একদিন মাটিতে মিশে যেতে পারে। তখন কয়েক শতকের একটি সম্ভাব্য ইতিহাস হয়তো শুধু মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কথাতেই টিকে থাকবে।


প্রকাশিত: September 19, 2026 | সময়: 4:43 am | সুমন শেখ