সর্বশেষ সংবাদ :

লোডশেডিংয়ে হিমাগারের প্রায় ৭০ লাখ বস্তা আলু নিয়ে শঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার: বর্তমানে কমদামের সবজি বলতে আলুকেই বুঝানো হয়। এমনিতেই উৎপাদনের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে আলু বিক্রি হচ্ছে। তারপরেও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর কৃষক, হিমাগারমালিক ও আলু ব্যবসায়ীরা। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে জেনারেটর চালিয়ে হিমাগারের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। এতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু জেনারেটর চালিয়ে রাখাও সম্ভব নয় বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের চেয়ে ব্যয় বাড়ে প্রায় ১৫গুণ। ফলে জেলার ৪২টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় ৬৫-৭০ লাখ বস্তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, সংরক্ষিত প্রায় ১৫ লাখ বস্তা বীজ আলু ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগামী মৌসুমে বড় ধরনের বীজ-সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এক্ষেত্রে আলু ব্যবসায়ী কাম কৃষক ও রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড এবং হিমাগার কর্তৃপক্ষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মন্তব্য জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমান এগ্রো কোল্ডস্টোরেজের এক কর্মকর্তা জানান, আলু ভালো রাখতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ার কারণে হিমাগারের শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে পাখা চালু করা হলেও তীব্র গরমের কারণে কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ, জেনারেটর দিয়ে হিমাগারের মেশিন অনবরত চালু করা সম্ভব নয়। এতে একদিকে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়, অন্যদিকে বাড়ছে আলু নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আসমা হিমাগারের এক কর্মকর্তা বলেন, হিমাগারের মেশিনগুলো নির্দিষ্ট সময় ধরে চালাতে হয়। মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালিয়ে ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। হিমাগারে বীজ আলু সংরক্ষণ করা কৃষকেরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। আগামী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করা আলু নষ্ট হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে জানান তিনি। মবের টার্গেটও হতে পারে অনেকে। তবে তিনি বলেন বিদ্যুত কর্তৃপক্ষ আবাসিক এলাকার চেয়ে হিমাগারগুলোতে বেশী বিদ্যুৎ রাখার চেষ্টা করছেন।
আসমা হিমাগারের জিএম আশরাফ আলী বলেন, এই হিমাগারে একলাখ ৪৪ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষিত ছিলো। এখন রয়েছে প্রায় ৯২ হাজার বস্তা। রহমান হিমাগারের ব্যবস্থাপক আব্দুল হালিম বলেন এই হিমাগারে ২লাখ ২৫ হাজার বস্তা রক্ষিত ছিল। এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ হাজার বস্তা বের হয়েছে। অর্থাৎ মোট রক্ষিত আলুর মধ্যে তিন ভাগের এক আলু বের হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রহমান হিমাগার এক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করেই হিমাগারগুরো চলে। গরমের কারণে এমনিতেই হিমাগারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘ সময় মেশিন চালু রাখতে হয়। এর মধ্যে লোডশেডিং হলে পুরো প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। একটি কক্ষ ঠান্ডা করতে এক ঘণ্টা সময় লাগলে ৩০ মিনিট পর বিদ্যুৎ চলে গেলে আবার শুরু থেকে কাজ করতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়। জেনারেটরে প্রতিঘন্টায় ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। তিনি আরও বলেন, জেনারেটর ব্যবহার করলে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। হিমাগারে ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে পবা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের কৃষক নুর মোহাম্মদ বলেন, সবচেয়ে কমদামি সবজি আলু। একেতো দাম কম-এর ওপরে বিদ্যুতের ওভার লোডশেডিং-এর জন্য নষ্ট হলে. পচে গেলে-মরার ওপর খাড়ার ঘা হবে। ‘আগামী মৌসুমে বপনের জন্য হিমাগারে বীজ আলু রেখেছি, কিন্তু বিদ্যুতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তায় আছি। আলু নষ্ট হয়ে গেলে পরের বছর ভালো ফলন পাওয়া কঠিন হবে। তাই হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
অপরদিকে আলু ব্যবসায়ী কাম উৎপাদক আব্দুল হাকিম ও শামীম বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংএর বাহানায় স্টোরে রক্ষিত আলু নষ্ট বা পচে গেলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ দায়ি হবেন। কারণ তাদের সাথে এমনই কমিন্টমেন্ট থাকে যে, হিমাগারে রক্ষিত আলু বের না করা পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ রক্ষনাবেক্ষণ করবেন।
রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড-এর সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে ঠিকই কিন্তু হিমাগারগুলো সবোর্চ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে বলেই জানা গেছে। বর্তমানে প্রতিকেজি আলুর ভাড়া এতই বেশী যে জেনারেটর চালালেও তাদের লাভই থাকবে। আবার এখন যে পরিমান বিদ্যুত সরবরাহ পাচ্ছে তাতে তো জেনারেটর চালানোর প্রয়োজন হবে না। সরকারের ওপর বিদ্যুতের দায় চাপিয়ে আলু নষ্ট করার পায়তারা করলে তাদেরকে কৃষক-ব্যবসায়ীরা ছেড়ে দেবেন না। সর্বপুরি কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগারমালিকদের স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


প্রকাশিত: September 10, 2026 | সময়: 4:29 am | সুমন শেখ