, , ।
নুরুজ্জামান :
সড়কে যানজট। দামি গাড়িগুলো থেমে আছে। এক গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় ছোট্ট এক শিশু। হাতে কয়েকটি ফুল। মুখে অনুনয়-বিনয়-স্যার, ফুল নেবেন ? মাত্র দুই টাকা । নেননা স্যার। যে বয়সে শিশুটির স্কুলে যাওয়ার কথা , বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সে তাকে পথে-পথে ফুল বিক্রি করতে হচ্ছে। দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তার জন্য । প্রতিদিন তাকে বিক্রি করতে হচ্ছে নিজের শ্রম।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের শহর, বন্দর, ঘাট, কলকারখানা, ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাজারে অসংখ্য শিশু শ্রম দিচ্ছে। কেউ ভারী বোঝা বহন করছে, কেউ দোকান বা কারখানায় কাজ করছে, কেউ রিকশা-ভ্যান চালাচ্ছে। আবার সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় শিশুদের চোরাচালান ও মাদক পরিবহনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের উদ্যোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা, প্রকল্প ও কর্মসূচি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিশুশ্রম এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
দারিদ্র্য যেখানে প্রধান বাধা :
শিশুশ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য। দরিদ্র পরিবারের উপার্জন অনেক সময় পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট হয় না। ফলে সন্তানদেরও অল্প বয়সে কাজে পাঠাতে হয়।
কেউ ইট-বালু বহন করে, কেউ ওয়ার্কশপে ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে, কেউ হোটেলে বাসন মাজে। অল্প মজুরির বিনিময়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেও এসব শিশুর নেই যথাযথ নিরাপত্তা কিংবা শ্রম অধিকার। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষার অভাব। সংসারে খাবারের নিশ্চয়তা যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে শিশুর স্কুলের খরচ অনেক পরিবারের কাছে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ঝরে পড়ে শিশুরা।
ঘর থেকে ফুটপাত :
শুধু দারিদ্র্য নয়, পারিবারিক সহিংসতা, অবহেলা, নির্যাতন ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবও অনেক শিশুকে ঘরছাড়া করে। বাড়ির অশান্তি থেকে বাঁচতে কেউ দিনের পর দিন বাইরে থাকে। একসময় সেই বাইরে থাকাই স্থায়ী হয়ে যায়। ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাজার কিংবা কোনো বস্তি হয়ে ওঠে তার ঠিকানা। সকাল হলেই শুরু হয় জীবিকার সন্ধান। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ বোতল কুড়ায়, কেউ গাড়ি পরিষ্কার করে, কেউ ভিক্ষা করে। দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যেখানে জায়গা মেলে, সেখানেই রাত কাটে।
অপরাধ চক্রের সহজ শিকার :
আশ্রয়হীন ও শিক্ষাবঞ্চিত এসব শিশুরা সহজেই অপরাধচক্রের শিকার হয়। সামান্য অর্থ কিংবা খাবারের বিনিময়ে তাদের দিয়ে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালানে শিশুদের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মাদক পরিবহনেও তাদের ব্যবহার করা হয় বলে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে অর্থের জন্য একটি কাজ করলেও পরে কেউ কেউ মাদকাসক্তি ও অপরাধের জালে জড়িয়ে পড়ে। এমনি ভাবে একবার এই জগতে কেও ঢুকে গেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তার জন্যে অনেক কঠিন হয়ে যায়।
কাগজে পরিকল্পনা, বাস্তবতা ভিন্ন :
শিশুশ্রম বন্ধে আইন ও সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো প্রকল্প শুরু হলেও পর্যাপ্ত অর্থ, নজরদারি ও ধারাবাহিকতার অভাবে অনেক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে পারেনা । শিশুশ্রম নির্মূল করতে হলে শুধু অভিযান চালিয়ে বা আইন প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। শিশুর পরিবারকে অর্থনৈতিক ভাবে সক্ষম করতে হবে। ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।একই সঙ্গে শিশু পাচার, মাদক ও চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভবিষ্যৎটা কার :
একটি শিশুর হাতে যখন বই-খাতা থাকার কথা । তখন সেই হাতে যদি উঠে আসে হাতুড়ি, শাবল কিংবা ভারী বোঝা, তাহলে শুধু ঐসব শিশুর শৈশবই নষ্ট হয় না, নষ্ট হয় তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। শিশুশ্রম বন্ধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় , পরিবার, সমাজ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সবার। তবে রাষ্ট্রকে নিতে হবে প্রধান দায়িত্ব। আজ যে শিশুটি দুই টাকার ফুল বিক্রি করছে, সঠিক শিক্ষা ও পরিচর্যা পেলে আগামী দিনে সে-ই হতে পারে সমাজের সম্পদ। তাই শিশুর হাতে শ্রমের বোঝা নয়, বই তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
শিশু বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের মতে :
শিশুশ্রম শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট করে না, এটি সমাজ ও দেশের অগ্রগতির পথেও বাধা সৃষ্টি করে। তাই শিশুশ্রম বন্ধ করতে সরকার, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।প্রতিটি শিশুর শিক্ষা, সুরক্ষা,নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার ।