বুধবার, ৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
কালাই প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের কালাইয়ে তালোড়া বাইগুনি খাল পুনঃখননে দায়সারা কাজ করে পুরো অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে প্রকল্প সভাপতির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তালিকায় প্রকৃত দরিদ্র শ্রমিকদের নাম বাদ দিয়ে প্রকল্প সভাপতি ও স্থানীয় উদয়পুর ইউপি সদস্যে আমজাদ হোসেন তাঁর স্বজন সহ বিত্তবান ব্যক্তিদের শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
প্রকল্পে সরকারি প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) অনুযায়ী কাজ না করেই খাল খনন কাজের নিদ্ধারিত সময় ২৯ জুন সমাপ্ত টেনেছেন। এতে করে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় পড়ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
কালাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় (পিআইও) সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া বাইগুনিতে ৫২ লাখ টাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার দৈর্ঘ্য খাল পুনঃখনন কাজ শুরু হয় চলতি বছরের ১৩ মে এবং শেষ হওয়ার কথা ২৯ জুন।
সিডিউল অনুযায়ী খালের ওপরের প্রস্থ ২০ ফুট (গ্রামের ভেতরের বা ব্যাকের কিছু অংশে ১৫ ফুট), তলদেশের প্রস্থ ৮ ফুট এবং গভীরতা ৫ ফুট নির্ধারণ করা হয়। তবে সরেজমিনে গিয়ে ওই খাল পুনঃখননের চিত্র উল্টো দেখা গেছে, খালের শুরুতে অল্প কিছু অংশে ২০ ফুট প্রস্থ ঠিক রাখা হলেও অধিকাংশ স্থানে ১৫ ফুট আবার কিছু স্থানে ১৯ ফুট পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। গড়ে খালের ওপরের প্রস্থ সাড়ে ১৫ ফুটের বেশি নয়। তলদেশের প্রস্থও নির্ধারিত ৮ ফুটের পরিবর্তে অধিকাংশ স্থানেই ৬ ফুটের নিচে দেখা গেছে। খনন কাজে পুরো খালের গভীরতা ৫ ফুট করার কথা থাকলেও প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় কোনো কাজ করার চিহ্ন বা নমুনা পাওয়া যায়নি।
এছাড়া দীর্ঘ অংশজুড়ে কচুরিপানা অপসারণ না করায় পানি চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। খাল পুনঃখনন কাজে কর্মসংস্থানের জন্য প্রকল্পের নির্ধারিত ১২৫ জন শ্রমিকের নাম দেওয়া থাকলেও কাজ করেছেন ৫০ থেকে ৫৫ জন। সেই তালিকায় প্রকৃত এলাকার দরিদ্র শ্রমিকদের নাম থাকার কথা থাকলেও পরিবর্তে বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রকল্প সভাপতি আমজাদ হোসেনের নিকট আত্মীয়দের নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে বেশকয়েকজন শ্রমিক বলেন, তালিকায় যাদের নাম আছে, তাদের মধ্যে বেশীভাগই কাজ করেনা। অনেকেরই ১০ থেকে ২০ বিঘা পর্যন্ত আবাদি জমি রয়েছে। অথচ তাঁদের নাম ব্যবহার করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করছে প্রকল্প সভাপতি। এতে এলাকার প্রকৃত শ্রমিকরা কাজ ও মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই ধরনের অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদেরও। তাঁদের ভাষ্য, নিয়ম অনুযায়ী খননকাজ করা হয়নি। অর্থ লুট করা হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও তালোড়া-বাইগুনি গ্রামের বাসিন্দা ছুমির জালাল বলেন, বলতে গেলে অনেককিছুই বলতে হয়। না বললে থাকাও যায়না। খালটি খননের আগেই ভাল ছিল, এখন যেভাবে খনন করা হয়েছে, তাতে কৃষকদের গলায় আরও কাটা স্থায়ী হলো। প্রকল্প সভাপতি বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, তাঁর ভয়ে কেউ এলাকায় কথা বলতে সাহস পায় না। এমনকি প্রশাসনের লোকজন খাল পরিদর্শনে এসে অনিয়ম দেখেও না দেখার ভান করে চলে যান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, খাল কাটার কাজ শতভাগের ওপর হয়েছে। যারা অনিয়মের অভিযোগ করছেন, তারা মিথ্যা বলছেন। সঠিকভাবে পরিমাপ করলে কোথাও ওপরের প্রস্থ ২০ ফুটেরও বেশি, তলদেশ ৮ ফুটের বদলে ৯ ফুট এবং গভীরতা ৫ ফুটের পরিবর্তে ৭ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত রয়েছে।
সিডিউলের চেয়ে বেশি কাজ করেছেন, কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কৃষকদের স্বার্থে করেছি। পানি নিষ্কাশনের সমস্যা থাকায় এবার গত মৌসুমে এই এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০ বিঘা জমির আলু পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই কাজ করেছি।
কালাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাসিবুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের সময় শেষ হলেও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। অনেক অংশে সঠিকভাবে খনন করা হয়নি। আমরা সরেজমিনে যে পরিমাপ পাব, সে অনুযায়ীই বিল পরিশোধ করা হবে। যেসব অংশ এখনো খনন হয়নি, সেগুলো আগামী অর্থবছরে পুনঃখনন করা হবে। শ্রমিক তালিকায় প্রকল্প সভাপতির স্বজন ও বিত্তবানদের নাম থাকার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেন, আপনারা সরেজমিনে গিয়ে যে বাস্তব চিত্র পেয়েছেন, সেটাই লিখতে পারেন।