সর্বশেষ সংবাদ :

জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন: মহানগরীতে ৬৬ হাজার ও জেলায় ৩ লাখ শিশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা

স্টাফ রিপোর্টার: নগর ভবনের সরিৎ দত্ত সভাকক্ষে রাজশাহী সিটি করপোরেশন আয়োজিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন ২০২৬ উপলক্ষ্যে ওরিয়েন্টেশন ও পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন।
রাজশাহী মহানগরীর শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে সারা দেশের ন্যায় আগামী ২৮ জুন রাজশাহীতে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন পালিত হবে। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় মহানগরীর মোট ৬৬ হাজার ৩৯৫ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্যাম্পেইনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ওই দিন ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী ৯ হাজার ১ শত ১৩ জন শিশুকে নীল রঙের এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৫৭ হাজার ২ শত ৮২ জন শিশুকে লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। এই কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মহানগরীতে মোট ৩৮৪টি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে ২ জন করে মোট ৭৬৮ জন স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করবেন।
মহানগরবাসীর স্বাস্থ্য সেবায় সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে রাসিক প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে মহানগরবাসীর সেবায় নিয়োজিত করেছেন। আমি নাগরিকদের মৌলিক চাহিদাগুলো বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান সরকারের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সেবা এখন জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দেওয়ায় হার্টের স্টেন্ট, চোখের লেন্স ও ডায়ালিসিসের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসায় আমদানী শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ফলে জটিল রোগের চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে, যা আগে অনেকের জন্য দুঃসাধ্য ছিল।
বিগত সময়ে হাম ও রুবেলার প্রকোপ মোকাবিলায় গৃহীত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কথা স্মরণ করে প্রধান অতিথি বলেন, সকলের সচেতনতা ও সহযোগিতার ফলেই রাজশাহী এই সংকট থেকে রক্ষা পেয়েছে। তিনি পূর্ববর্তী সময়ের অবহেলার সমালোচনা করে বলেন, টিকা কার্যক্রমে গাফিলতির কারণে অতীতে অনেক শিশুকে হারাতে হয়েছে, যা বর্তমান সরকার কঠোরভাবে প্রতিরোধ করছে।
সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সব ধরনের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে প্রশাসক বলেন, মেডিকেল সেক্টরের বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী এই সেক্টরকে আরও এগিয়ে নিতে সিটি কর্পোরেশন বদ্ধপরিকর। শিশুদের উজ্জ্বল ও সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়তে এই ক্যাম্পেইন সফল করতে তিনি সকল অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম এর সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. হাবিবুর রহমান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহিদা ইয়াসমিন ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ড. কস্তুরি আমিনা কুইন ও ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. আনোয়ারুল ইসলাম।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানগণ, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ এবং গণমাধ্যমকর্মীগণ।
রাজশাহী সিভিল সার্জন: আগামী ২৮ জুন (রবিবার) সারাদেশের ন্যায় রাজশাহী জেলায় জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন উদযাপিত হবে। ওইদিন সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। এবারের ক্যাম্পেইনে রাজশাহী জেলায় ৬ মাস থেকে ১১ মাস বয়সী ৩৩ হাজার ৬ শত ৪৮ জন শিশুকে এবং ১২ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ২ লক্ষ ৬৯ হাজার ৪ শত ৬৯ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট ৩ লাখ ৩ হাজার ১১৭ জন শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন উপলক্ষে জেলা পরিকল্পনা সভা- ২০২৬ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
সভায় আরও জানানো হয়, এই কার্যক্রম সফল করতে জেলাজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে ১০টি স্থায়ী কেন্দ্র এবং ইপিআই কার্যক্রমের আওতাভুক্ত ১ হাজার ৭ শত ৭৮টি অস্থায়ী কেন্দ্রসহ মোট ১ হাজার ৭ শত ৮৮টি কেন্দ্রে শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে ৩ হাজার ৫ শত ৭৬ জন স্বেচ্ছাসেবী মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত থাকবেন ।
সিভিল সার্জন ডা. এস. আই. এম রাজিউল করিম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান এবং পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক।
সভায় বক্তারা বলেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। অতীতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল না খাওয়ানোর ফলে দেশে হামের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল এবং অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তবে সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে বর্তমানে সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
তাঁরা বলেন, শহরের তুলনায় দূরবর্তী বা প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক মা এখনও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের গুণাগুণ বা এটি না খাওয়ানোর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নন। তাই সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ ও দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে একটি শিশুও এই সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।
বক্তারা আরও বলেন, এই ক্যাম্পেইনটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আজকের সুস্থ শিশুই আগামী দিনের উন্নত বাংলাদেশের কর্ণধার। একটি দুর্বল শিশু কখনোই জাতির সম্পদ হতে পারে না। তাই প্রতিটি পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে এই ক্যাম্পেইনকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে একই স্থানে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন উপলক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সিভিল সার্জন ডা. এস. আই. এম রাজিউল করিম সভাপতিত্ব করেন।
সিভিল সার্জন বলেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ানেই। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, একটি শিশুও যেন এই কার্যক্রম থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সজাগ রয়েছে এবং প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান। ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের ‘প্লাস’ চিহ্নের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ক্যাপসুল খাওয়ানোর পাশাপাশি অভিভাবকদের মাঝে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ সুষম খাবার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এ সময় তিনি কোনো প্রকার কুসংস্কার ও গুজবে কান না দিয়ে এবং আতঙ্কিত না হয়ে শিশুদের নিকটস্থ কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান এবং সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ব্যাপক প্রচারের জন্য অনুরোধ জানান।


প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬ | সময়: ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ